নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের তেল চুরির ঘটনা নতুন কিছু না। দীর্ঘদিন ধরে একটি চিহ্নিত সিন্ডিকেট নিয়মিত তেল চুরি ও পাচারের সাথে জড়িত। ফলে অভিযান চালিয়েও বন্ধ করা যাচ্ছে না দেশের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানের চুরির চিরচেনা দৃশ্যপট। সারাদেশে যখন জ্বালানি তেলের চরম সংকট চলছে, ঠিক তখনও থেমে নেই তেল চুরি ও পাচার।
তেল চুরির এই সিন্ডিকেটের খোঁজে অনুসন্ধানে নামে দৈনিক এদিন। অনুসন্ধানের বেরিয়ে আসে সর্ষের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভূত। ফারুকুল ইসলাম ফাহাদ নামে চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারীর হাতে তেল চুরির চাবি। অথচ এই অপরাধীকে ধরার দায়িত্বে থাকা বড় কর্তারা চোরের হাতে চাবি দিয়ে ঘুমাচ্ছেন নিশ্চিন্তে।
এতোদিন যার নুন আনতে পান্তা ফুরাতো, অথচ আজ তিনি শত কোটি টাকার রাজপ্রাসাদের মালিক! সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল পদ্মা ডিপোর সাধারণ চেকার ফারুকুল ইসলাম ফাহাদের বিরুদ্ধে উঠেছে দিনেদুপুরে জ্বালানি তেল চুরির রোমহর্ষক অভিযোগ। ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের পাশাপাশি আকাশচুম্বী মূল্যের বিমান চলাচলের ‘জেড ফুয়েল’পর্যন্ত পাচার হচ্ছে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তদন্ত কমিটির কঠোর শাস্তির সুপারিশ এবং দুদকের নোটিশের পরও কীভাবে বহাল তবিয়তে বহাল আছেন এই ‘তেল চুরির চাবি’খ্যাত বাদশা ফাহাদ? সর্ষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এই ভূত আর তেল চুরির নেপথ্য কাহিনি নিয়ে আমাদের বিশেষ অনুসন্ধান।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে ফারুকুল ইসলাম ফাহাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার কর্মস্থলে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। ডিপোর নিরাপত্তাকর্মীদের দাবি, তিনি নিয়মিত অফিসে থাকেন না এবং এলেও বেশিক্ষণ অবস্থান করেন না। পরে তার বাসায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলী নয়াপাড়া ভান্ডারীপুল এলাকার মৃত আব্দুল হামিদের ছেলে ফারুকুল ইসলাম ফাহাদ। ২০১১ সালে চাকরি পান সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল বার্মাশীল এলাকার পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড পিওসিএল ডিপোতে। চাকরি পাওয়ার পর তেল চুরির রাস্তা পেয়ে ফাহাদ রাতা রাতি হয়ে যায় কোটিপতি। কদমতলী এলাকায় কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করে রাজকীয় বাড়ি, নামে বেনাবে গড়ে তুলেন সম্পদের পাহাড়। রাজকীয় এ বাড়ির মালিক কে জানতে চাইলে, একই এলাকার কুলসুম বেগম উপহাস করে বলেন, ৬-৭ বছর আগেও বাথরুমে যেতে যার বদনা ছিলনা এটা সেই ফাহাদের রাজপ্রাসাদ।
বার্মাশীলের বাসিন্দা তেলবাহী গাড়ির স্টাফ গোলজার হোসেন জানান, চেকার ফাহাদ সিন্ডিকেট ডিপো থেকে দৈনিক ২ থেকে আড়াইহাজার লিটার জেডফুয়েল (বিমানের তেল), ২ হাজার লিটার ডিজেল, ৪ হাজার লিটার অকট্রেন ও পেট্রোল পাচার করছে চুরি করে। দেড়শত থেকে দুশত লিটার করে ৪০ থেকে ৫০টি গাড়ি দিয়ে দৈনিক ৮ থেকে ৯ হাজার লিটার তেল পাচার করে ডিপোর বাইরে বিক্রি করছে। বর্তমান দরে যার মূল্য ১২ লক্ষাধিক টাকা। তিনি আরো জানান, জেডফুয়েল পাচারে রয়েছেন কাজী মামুন, সাইফুল ও রবি। ডিজেল পাচারে শুভ, শাহিন আর অকট্রেন ও পেট্রোল পাচারে রয়েছেন শাহ আলম ওরফে কালা শাহ আলম। চুরি তদারকি করেন ফাহাদের নিয়জিত রবি ওরফে মাইগ্যা রবি।
ডিপোতে সাধারণ একজন চেকারের এত প্রভাব বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দা তেল ব্যবসায়ী পারাগ মিয়া জানান, আওয়ামী লীগ সরকার আমলে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি শামীম ওসমানের প্রভাবখাটিয়ে তেল চুরির সেন্টিকেট গড়ে তুলে ফাহাদ। স্থানীয় লোক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কারণে ডিপোর কর্মকর্তারাও দর্শকের ভূমিকায়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও অদৃশ্য ক্ষমতাবলে বহাল তবিয়তে ফাহাদের তেল চুরি অব্যাহত রয়েছে।
একই এলাকার নাজমুল হোসেন সজিব কাজী জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও জেলার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে শামীম ওসমান অনুসারীদের প্রভাব রয়েছে। ফলে অপকর্ম অব্যাহত রেখেও পার পেয়ে যাচ্ছে ওসমান পরিবারের অনুসারী ফাহাদ। সরকারি চাকরিজীবী হয়েও তিনি বিগত সময়ে রাজনৈতিক দলের নেতার মত আওয়ামী লীগের প্রতিটি দলীয় কর্মসূচি পালন করেছেন। লোকজন নিয়ে মিছিলসহকারে যোগ দিয়েছেন শামীম ওসমানের জনসভায়। আওয়ামী লীগ আমলে ফাহাদ ব্যতিত অন্য কোন নেতা পদ্মা ডিপো নিয়ে যেন মাথা না ঘামায় শামীম ওসমানের এমন কঠোর নির্দেশ ছিল। ফলে ফাহাদ বেপরোয়া হয়ে উঠে। এখনো তার দাপট কমেনি।
চেকার ফারুকুল ইসলাম ফাহাদের বক্তব্য জানতে একাধিক বার তার কর্মস্থলে গিয়েও পাওয়া যায়নি। ডিপোর সিকিউরিটিরা জানায়, ফাহাদ ঠিকমত অফিসে আসেনা। আসলেও বেশিক্ষণ থাকে না। তার বাসায় গিয়েও দেখা মিলেনি। তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
গোদনাইল পদ্মা ডিপোর ম্যানেজার আমিনুল হক বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি,ফারুকুল ইসলাম ফাহাদকে তার মূল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পাম্প লাইনে দেওয়া হয়েছে। সে আর তেল চুরি করার সুযোগ পাবেনা। ডিপো থেকে তেল লোড করে বাহিরে গিয়ে গাড়ি থেকে তেল চুরি করার দায় আমাদের না। আসা যাওয়ার সময় আমি নিজেও তেল চুরির দৃশ্য দেখি। তাই বাইরের চুরি বন্ধের জন্য প্রশাসনিকভাবে ব্যাপস্থা গ্রহণের জন্য চেষ্টা করছি।
অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে, অদৃশ্য শক্তির ইশারায় সিন্ডিকেট গড়ে তোলে দীর্ঘদিন ধরে বীরদর্পে লাখ লাখ টাকার জ্বালানি তেল চুরি করছে সাধারণ একজন চেকার (চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী) আওয়ামী লীগ সমর্থক ফারুকুল ইসলাম ফাহাদ। তেল চুরিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত বছরের ৩ জুন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের পরিচালক বরাবর লিখিতভাবে অনুরোধ করেন মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন (বণ্টন ও বিপণন)।
তার আগে ডিপোর তেল চুরি ও অনিয়ম নিয়ে ফাহাদ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি তদন্ত কমিটি হয়। তদন্ত শেষে ফাহাদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে একই বছরের ১৫ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কমিটি।
মহাব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ (বণ্টন ও বিপণন) স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনের পরও অদৃশ্য কারণে ফাহাদকে বহাল রেখে তার আপন বড় ভাই আনোয়ারসহ ১১ জন কর্মচারী। কর্পোরেশন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশকারী কর্মকতাকে। অন্যদিকে তেল চুরি করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ফাহাদের বক্তব্য ও তথ্য প্রমাণ জমা দেওয়ার জন্য গত বছরের ১০ এপ্রিল নোটিশ দেন দুর্নীতি দমন কমিশন নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক বেলায়েত হোসেন। রহস্যজনক কারণে দেড় বছর ধরে দুদকের তদন্ত তৎপরতাও থমকে আছে।
তবে নোটিশ প্রদানকারী দুদক কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন বলেন, তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্তকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। ডিপোর কোন কর্মকর্তা তেল চুরির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলে তার অপসারণ দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করানোর অভিযোগও রয়েছে চেকার ফাহাদের বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের অধিনস্থ পদ্মা অয়েল কোম্পানি পিওএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল পদ্মা ডিপোর চেকার ফারুকুল ইসলাম ফাহাদের তেল চুরির বিষয়ে আমার জানা নেই। খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী ( ক্রাইম অ্যান্ড অপরাধ) বলেন, যেকোন অপরাধ আমাদের নজরে আসলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করি। ফারুকুল ইসলাম ফাহাদের বিরুদ্ধে আমাদের কাছে কোন অভিযোগ জমা হয়নি। অভিযোগ জমা হলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









