জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি এক লাফে ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জনজীবনে। পরিবহন থেকে শুরু করে নিত্যপণ্য– সবকিছুর দামই চড়তে শুরু করেছে। পাঁচ মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়ে সরকারকে এ সিদ্ধান্তকে সরে আসার দাবিও তুলেছে বিভিন্ন সংগঠন। এসব সংগঠনের নেতারা বলছেন, জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে ‘চরম অস্থিরতা’বিরাজ করছে; এর মধ্যে এক লাফে এতটা দাম বাড়ানো মানুষের ‘পকেট কাটার শামিল’।
অর্থাৎ বিশ টাকার বিষ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। অবশ্য বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির গতকাল মঙ্গলবার সিলেটের লাক্কাতুরা চা–বাগান ফ্যাক্টরি মাঠে সাংবাদিকদের বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যাতে মূল্যস্ফীতি না বাড়ে এবং পণ্যের সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়, সে জন্য সরকার সরবরাহ-ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণাই মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কারণ তেলের দাম শুধু পরিবহন ব্যয়ই বাড়ায় না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে। শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির ব্যয়- সবখানেই বাড়বে খরচ। সেই বাড়তি ব্যয়ের শেষ বোঝাটিও বহন করতে হবে সাধারণ ভোক্তাকেই। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। তাই জ্বালানি তেলের মূল্যবদ্ধি প্রভাবে পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ার কথা অসাধুর কারসাজি করে বেশি না বাড়াতে পারে সেদিকে তদারকি সংস্থার নজরদারি করতে হবে।
গত রবিবার রাত ১২টা থেকে থেকে চার ধরনের জ্বালানি তেলের লিটার এক লাফে ২০ টাকা বাড়ায় সরকার। নতুন দর অনুযায়ী, ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোলের লিটার পড়ছে ১৬০ টাকা। এর আগে গত এপ্রিলে এই চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সেবার ডিজেল লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০, পেট্রোল ১১৬ থেকে ১৩৫ এবং কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়। রবিবার মধ্যরাত থেকে নতুন দর কার্যকর হওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে।
নিত্যপণ্যের চড়া দামে এমনিতেই দিশাহারা মানুষ। সংসারের হিসাব মেলাতে যখন হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে, ঠিক তখনই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। তেলের দাম বাড়ার এক দিন না যেতেই বাজারে উত্তাপ ছড়িয়েছে সবজি, আটা-ময়দা, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্যের দামে। আয় না বাড়লেও একের পর এক বাড়ছে মানুষের খরচ। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়ের বাড়তি চাপ- সব মিলিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সব শ্রেণি-পেশা ও সাধারণ মানুষ। সবার আশঙ্কা- তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়বে। সরকারকে তাদের বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাজার স্থিতিশীল রাখতে জোরদার করা হবে নজরদারি, নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।
পঞ্চগড় ও খুলনা থেকে সবজি এনে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে বিক্রি করেন আড়তদার মো. ইদ্রিস ফকির। গতকাল সকালে আড়তেই কথা হয় তার সঙ্গে। ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন খরচ চার হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি। ইদ্রিস ফকির বলেন, ‘চার হাজার টাকা বাড়তি। এই চার হাজার টাকার খরচ মালামালের উপর পড়ব না? শনিবার রাতে পঞ্চগড় থেকে ঢাকার গাড়ি ভাড়া করলাম ২৬ হাজার ৫০০ টাকা। আজ ভাড়া করলাম ৩০ হাজার ৫০০ টাকায়। খুলনার গাড়ি আনছিলাম ১৪ হাজার ৫০০, আজ ১৭ হাজার ৫০০; তিন হাজার বাড়তি। এই বাড়তি টাকা মালটার ওপর পড়ব। তাইলে দাম অটো বাইড়া যাইব। কাল থিকাই সবজির দাম বাড়ব।’
মানিকগঞ্জ থেকে সবজি কিনে আনেন এই বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মো. সাজু রহমান। তিনি বলেন, ‘গাড়িভাড়া ছিল ২ হাজার ৬০০ টাকা। আজ সকালে মাল আনলাম ৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে; ৯০০ টাকা বাড়তি। এটা তো আমার পকেট থেকে দিব না। কাস্টমারের কাছ থেকে নিতে হবে। কেজিতে ১০ টাকা বাড়ব। খুচরা, যারা আমাদের থাইকা কিনা নিয়ে যায়, তারা আরো বেশিতে বেচব। বাড়তি টাকা চাইলে কাস্টমারের সঙ্গে মন কালাকালি হইব।’
তেলের দাম বাড়ার কারণে গাড়ি ভাড়া নিয়ে মালিক ও ব্যাপারীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হওয়ার কথা জানান পিকআপ চালক আমির বিশ্বাস। সিংগাইর থেকে প্রতিদিন মালবোঝাই পণ্য ঢাকার বিভিন্ন বাজারে আনেন আমির। তিনি বলেন, ‘তেলের দাম কিছুদিন আগে বাড়ল। হঠাৎ করে আবার বাড়ল। ভাড়া বাড়তেছে। যেকোনো মানুষ ভাড়া বাড়ার বিষয়ে বললে দিতে চায় না। প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল লাগে। সিংগাইর থেকে ঢাকায় প্রতিদিন পারমানেন্ট ট্রিপ দুই হাজার টাকা। আজ মালিক ফোন কইরা বলল ২৫০০ টাকা ভাড়া ধরার জন্য। তাতে ব্যাপারী সকালে আমার সঙ্গে রাগারাগি করছে। আমি বলছি, আমার সঙ্গে কথা না বলে মালিকের সঙ্গে কথা বলেন। তেলের দাম বাড়ার কারণে আমাদের খরচ বেড়ে গেছে।’
ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির বলেন, তেল সংকটের সময় তখন ৫-৭ হাজার টাকা ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। দুদিন আগেও বগুড়া থেকে একটি ট্রাক ঢাকায় আসতে ভাড়া ছিল ১৮-২০ হাজার টাকা। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে ২-৩ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে।
মহাখালী এলাকায় দুপুরে বাসস্ট্যান্ডের কোনায় প্যাডেল রিকশা নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষায় ছিলেন মকবুল মিয়া। তিনি ২০ বছর ধরে রিকশা চালান; বাড়ি ময়মনসিংহ। সাড়ে তিন হাজার টাকা ভাড়ায় সাততলা বস্তির মসজিদ এলাকায় স্ত্রীসহ একটি ছোট বাসায় থাকেন তিনি। আগেও তেলের দাম বাড়ার কারণে তার দৈনন্দিন ব্যয় বেড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার বাড়তি তেলের দাম তার কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তিনি বলেন, সবজি খাওন লাগে ৪০/৪৫ টেহায়। মোটা চাল খাওন লাগে ৬৫ টেহায়। সারাদিনে আয় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। জমা দেওন লাগে দেড়শ। কী বাজার খামু, কী ওষুধপত্র খামু, কী করমু, একমাত্র আল্লাহ জানে।’
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা সদরের বাসিন্দা ইসলাম তালুকদার। বাবা, স্ত্রী, ছেলেসহ চারজনের সংসার তার। প্রায় ১৪ বছর ধরে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালান। গত রবিবার তিনি সারাদিন ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে আয় করেন ৭০০ টাকা। কিন্তু হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় একদিনের ব্যবধানে সোমবার তার আয় নেমে আসে একেবারে শূন্যতে। খালি পকেটে বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাকে। এভাবে চললে পেশা বদল ছাড়া উপায় নেই। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব জানতে চাইলে অনেকটা হতাশা আর আক্ষেপের কথা শোনান ইসলাম তালুকদার।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, একদিনের ব্যবধানেই রাজধানীর খুচরা বাজারে বেগুন, শসা, কাঁচামরিচ, ডিম, রসুন, আটা-ময়দা ও ভোজ্যতেলসহ অন্তত ১০টি পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে আয় না বাড়লেও নিত্যদিনের খরচ আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। ফলে নতুন করে আনা পণ্যের ক্ষেত্রে বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। রাজধানীর বাজারগুলোতে গতকাল প্রতিকেজি বেগুন আকার ও মানভেদে ৯০ থেকে ১৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। দুদিন আগে এর দাম ছিল ৮০ থেকে ১২০ টাকা। শসা বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৮০ টাকা, যা আগের দিন সর্বনিম্ন ৪০ টাকা ছিল। কাঁচামরিচের দাম বেড়ে হয়েছে ১০০ থেকে ১৬০ টাকা। দুই দিন আগে ফার্মের ডিমের প্রতি হালি ৫০ টাকা থাকলেও এখন তা ৫৫ টাকা। এছাড়া খুচরা পর্যায়ে বড় দানার মসুর ডাল প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৯৫-১০০ টাকা। যা আগে ৯০-১০০ টাকা ছিল। প্রতিকেজি খোলা আটা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা আগে ৪৮ টাকা ছিল। পাশাপাশি প্রতিকেজি খোলা ময়দা প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা। যা আগে ৬৫ টাকা ছিল। খোলা পামওয়েল বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৭০ টাকা। যা আগের দিনও ১৬৬ টাকা ছিল।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নবোদয় বাজারে নিত্যপণ্য কিনতে এসেছেন মো. সোহাগ। তিনি বলেন, ‘আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৪২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করি। বাবা-মা, স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে আমার সংসার। সেখান আমিসহ তাদের খাবার জোগাড় করতে মাসে ৫০ কেজির এক বস্তা চাল ৪ হাজার, ৫ লিটার তেল এক হাজার, বাসা ভাড়া ১৪ হাজার, সবজি, মাছ, ব্রয়লার মুরগিসহ তরকারি রান্নার উপকরণ কিনতে ৯ হাজার, গ্যাস সিলিন্ডার ৩০০০, সাবান-ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পু ৫০০, মুদি বাজার আরো ২ হাজার, বিদ্যুৎ বিল ২ হাজার ও মোবাইল টকটাইমে খরচ হয় ৫০০ টাকা। মা-বাবার হাতে ৫ হাজার টাকা দিলে সব মিলিয়ে খরচ হয় ৪১ হাজার টাকা। সংসারের খরচ বহন করতে না পেরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছি। এর মধ্যে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। এতে খাবারসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। কী করব তাই বুঝতে পারছি না।’
নবোদয় বাজারের মুদি ব্যবসায়ী রতন মিয়া বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন ভাড়া বেড়ে গেছে। তাই যেসব পণ্য নতুন করে আনতে হয়েছে, সেসব পণ্যের দাম জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এক দিনের মাথায় দাম বেড়েছে।
সরকারের তরফ থেকে সিদ্ধান্ত আসার আগেই অবশ্য গণপরিবহনে ভাড়া বেড়ে গেছে। দূরপাল্লা ও শহরের ভেতরের বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ এসেছে যাত্রীদের কাছ থেকে। তারা বলেছেন, ঢাকার অভ্যন্তরে বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। আর দূরপাল্লার বাসে বেশি নেওয়া হচ্ছে একশ টাকা পর্যন্ত। প্রতিদিন মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান থেকে বাংলামোটরে অফিস করেন এনজিও কর্মী নয়ন। তিনি বলেন, শ্যামলী থেকে বাংলামোটর ভাড়া ১৫ টাকা। আজ সকালে ‘লাব্বাইক’বাস ২০ টাকা চায়। কেউ দিচ্ছে, কেউ দিচ্ছে না। যাত্রীদের সঙ্গে হেলপারদের বিতণ্ডা চলে। সরকারের সিদ্ধান্ত আসার আগেই বাড়তি ভাড়া নেওয়ার কারণ হিসেবে ‘অরিন পরিবহনের’কাউন্টারে বসে থাকা কর্মী মনসুর আলী বলেন, তেল তো বাড়তি টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ভাড়া বেশি না নিলে কি গাড়ি বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকব? আগের ভাড়া নিলে তো প্রতি ট্রিপে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লোকসান হবে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে স্থলবন্দরে। বেনাপোলে স্থানভেদে ট্রাক ভাড়া পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার কথা শুনিয়েছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাক মালিকরাও ভাড়া বাড়িয়েছেন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। এতে ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর খরচ বেড়েছে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়েও। এক্ষেত্রে চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইসিডিএ)। বিআইসিডিএ মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, কন্টেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের দাম রয়েছে। আমরা সবগুলোতে গড়ে ৯.৮৫ শতাংশ করে বাড়িয়েছি; যেটা আজ থেকে কার্যকর হচ্ছে।
একদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। তার ওপর আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের বাড়তি মূল্য দিতে অনীহা। অর্ডার কমে যাওয়া এবং একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ার চাপও সামলাতে হচ্ছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে। এমন এক সময়ে নতুন করে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। ফলে সংকটে থাকা এই শিল্পের উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির সময়টিতে তৈরি পোশাক খাত নানা ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা, অর্ডার কমে যাওয়া এবং কারখানা বন্ধ হওয়ার মতো সমস্যার সঙ্গে লড়তে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পোশাকশিল্পে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। প্রথমত, নিজেদের জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, পরিবহন খাতে খরচ বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে আমদানি ও রপ্তানি-দুই ক্ষেত্রেই। তৃতীয়ত, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে এবং বিভিন্ন খাতে মজুরি বাড়ানোর দাবিও জোরালো হতে পারে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য, ভর্তুকি কমানো বা অন্য কোনো ব্যবস্থার কারণে সরকার জ্বালানির দাম বাড়িয়ে থাকতে পারে। তবে জ্বালানির দাম বাড়ার পর এর প্রভাব কিভাবে কমানো যায়, তা নজরদারিতে রাখতে হবে। তিনি বলেন, জ্বালানির দাম ২০ টাকা বাড়লেও কেউ যেন সেই সুযোগ নিয়ে পণ্যের দাম ৫০ টাকা বাড়াতে না পারে, সেদিকে নজর দিতে হবে।
সরকারি চাকুরেদের বেতন দ্বিগুণ বা এর চেয়ে বেশি বাড়িয়ে চলতি সপ্তাহে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। বেতন বৃদ্ধির প্রভাবে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো কতটা যৌক্তিক হলো, সেই প্রশ্ন উঠেছে। দাম বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারকে সামনে আনছে সরকার। দাম না বাড়ালে সরকারের অন্যান্য সেবা ব্যাহত হতো, এমন কথাও বলা হচ্ছে। সোমবার মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিংয়ে এসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এটি না করা হলে সরকারের টিকা কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কম মূল্যে খাদ্য সরবরাহের মতো কার্যক্রম ‘বিঘ্নিত’ বা ‘স্থগিত’ হয়ে যেত। একই দিন সচিবালয়ে বাজার পরিস্থিতি বিষয়ক সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশকেও এর অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হয়। সরকার ভোক্তাদের ওপর পুরো চাপ একবারে না দিয়ে একটি অংশ বহন করলে শেষ পর্যন্ত তা রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপরই পড়ে। তাই জ্বালানির দক্ষ ও সাশ্রয়ী ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার দাম বাড়ার যুক্তি শোনালেও সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক দাম কমে আসার এ যুক্তি তুলে ধরে কেউ কেউ সরকারের কাছে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি তুলেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম মনে করেন, জ্বালানি সেবা দিতে যেটুকু টাকা খরচ হবে, সরকার শুধু সেটুকুই জনগণের কাছ থেকে নেবে। আর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সহনীয় পর্যায়ের কিছু রাজস্ব আহরণ করবে। কিন্তু সরকারের রাজস্ব আহরণ অত্যন্ত বেপরোয়া।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









