যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন (ইউএনজিএ'র) সাইড ইভেন্টগুলোর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ছিল পাটনারস ফর মাল্টিলেটারেলিজম (পিফোরএম) সামিট বা বহুপাক্ষিকতার অংশীদারদের সম্মেলন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রাক্কালে এটি সমকালীন বিশ্ববাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ। এতে অস্ট্রেলিয়া, বার্বাডোস, ব্রাজিল, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ও কেনিয়া এ উদ্যোগকে একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে- যার লক্ষ্য বহুপাক্ষিক সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক আইন, শান্তি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধিকে শক্তিশালী করা।
কিন্তু বাংলাদেশ সদস্য হলেও সংশ্লিষ্ট কতর্পক্ষের উদাসীনতায় গুরুত্বপূন এ সামিটে অংশগ্রহণ করতে পারেনি বলে জানা গেছে। মূলত জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কমকর্তাদের অবহেলায় এমনটি ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, পিফোরএম (P4M) সামিটের ঘোষণায় বলা হয়েছে, আরো আন্তঃনির্ভরশীল ও ক্রমবর্ধমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পিফোরএম সম্মেলনটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে নয়, বরং ইউএনজিএর হাই লেভেল উইকের প্রান্তিক একটি সাইড ইভেন্ট হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা সময়টির গুরুত্বও বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
জাতিসংঘ বর্তমানে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক বিভাজন, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চাপের মুখোমুখি। তাই পিফোরএম সামিট বিভিন্ন অঞ্চল ও রাজনৈতিক অবস্থানের দেশগুলোর এমন একটি উদ্যোগ, যা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতিসংঘকেন্দ্রিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে সংরক্ষণ ও পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
সূত্র জানায়, এটি সার্বভৌমত্ব, শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি, আন্তর্জাতিক আইন এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার ওপর এর গুরুত্বারোপ বিশেষভাবে মধ্যম ও ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যাদের স্বার্থ অনেকাংশে পূর্বানুমেয় ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টে বাংলাদেশের অফিসিয়ালি অংশ না নেওয়াকে দায়িত্বগত অবহেলা বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
এ ব্যাপারে জানতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান (এপোলো’র) সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, জাতিসংঘে নিযুক্ত সাবেক এক কমর্কতা এদিনকে বলেন, উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ না থাকলেও বাংলাদেশ নিজে উদ্যোগী হয়ে এ সম্মেলনের অংশীদার হওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু কে বা কার সিদ্ধান্তে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করেনি সেটা আমার বুঝে আসে না।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৪ সেপ্টেম্বরের জেনারেল ডিবেটের বক্তৃতায় পিফোরএম সামিটের অগ্রসর করা নীতিগুলোর প্রতি বাংলাদেশের সংহতি প্রকাশ করা উচিত হবে বলে মনে করি। একই সঙ্গে বক্তৃতায় জোর দেওয়া উচিত যে বহুপাক্ষিকতা অবশ্যই প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধিত্বশীল হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা।
সূত্র জানায়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা, জলবায়ু কূটনীতি, উন্নয়ন ও মানবিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কারণে এই এজেন্ডায় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। যেহেতু ফোরপিএম নিজেকে সব অঞ্চলের অংশীদারদের জন্য একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বর্ণনা করেছে, তাই ঢাকার উচিত এর বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে স্বাগত জানানো এবং ভবিষ্যৎ বহুপাক্ষিক আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অবদান রাখার আগ্রহ প্রকাশ করা। বাংলাদেশের উচিত বিশ্বকে একটি সুস্পষ্ট বার্তা প্রদান করা যে বহুপাক্ষিকতা কোনো বিমূর্ত কূটনৈতিক আদর্শ নয়; বরং শান্তি, উন্নয়ন, সার্বভৌমত্ব এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এটি একটি বাস্তব প্রয়োজনীয়তা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সংস্থা ও গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে আরো শক্তিশালী সহযোগিতার আহ্বান জানাতে পারেন, অর্থবহ জাতিসংঘ সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন এবং আরো কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমেরুকেন্দ্রিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশের প্রস্তুতির কথা বলতে পারেন। এ ধরনের অবস্থান বাংলাদেশকে আজকের ফোরপিএম (P4M) উদ্যোগের মূল চেতনার প্রতি সংহতি প্রকাশের সুযোগ দেবে, একই সঙ্গে একটি স্বাধীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পররাষ্ট্রনীতির অবস্থানও বজায় রাখবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে তাঁর প্রথম ইউএনজিএ বক্তৃতায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতিসংঘের ১৯৮০ সালের বিশেষ অধিবেশনে প্রদত্ত শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বক্তৃতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রদত্ত বক্তৃতা থেকে কোটেশন থাকতে হবে, অবশ্যই। তাদের দুইজনের প্রদত্ত বক্তৃতাতেই বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট উদ্ধৃতি যোগ্য বাক্য এবং বাক্যাংশ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট অপর এক সূত্র জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদ নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও, আশা করি অপর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীদ্বয় এবং বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব ও বাছাইকৃত নয়া পররাষ্ট্র সচিব উভয়েই বিষয়গুলো গভীরভাবে লক্ষ্য রাখবেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় যে বিষয়গুলো থাকবে তা নিয়ে পররাষ্ট্র সচিব ইতিমধ্যে ঢাকা ত্যাগের আগে মিডিয়াকে কিছু ধারণা দিয়েছেন। ওই বিষয়গুলোর কিছু কিছু বেশ গতানুগতিক-কিন্তু, সহনীয় মাত্রায় উপস্থাপন করা যেতে পারে। উপরে উল্লিখিত বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় না থাকা খুবই দুর্ভাগ্যজনক, অগ্রহণযোগ্য এবং অপেশাদার গাফিলতি হিসেবে গ্রহণ করা হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









