হাজারো মানুষের সমাগমে জমজমাট পূর্বাচলের হাঁসের মাংসের রাজত্ব। খাবারের বিশেষ স্বাদের টানে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভোজনরসিকরা। রাস্তার ধারে খোলা পরিবেশে রান্নাবান্না, ধূলাবালির মাঝেই খাবার পরিবেশন এবং অস্বাস্থ্যকর প্রস্তুতপ্রণালির কারণে জনপ্রিয় এই খাবারের ক্ষেত্রটি এখন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছে।
পূর্বাচলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মূল সড়কের পাশেই বড় বড় পাতিল ও কড়াই বসিয়ে রান্না চলছে হাঁস, গরু, মুরগি ও মাছ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব প্রস্তুত করা খাবার রাখা হচ্ছে উন্মুক্ত অবস্থায়। অনবরত যানবাহন চলাচলের কারণে বাতাসে উড়া ধূলাবালি সরাসরি গিয়ে মিশছে খাবারে। এ ছাড়া হাঁস প্রসেসিংয়ের ক্ষেত্রে কোথাও আগুনে পোড়ানো, আবার কোথাও দীর্ঘসময় গরম পানিতে ডুবিয়ে রাখার প্রচলিত পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন পুষ্টিবিদ ও সচেতন দর্শনার্থীরা।
রাজধানীর বাড্ডা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মাহাবুব হাসান জানান, পূর্বাচলের মনোরম পরিবেশ এবং খাবারের বৈচিত্র্যের কারণেই ছুটির দিনে এখানে আসি। কিন্তু পরিবেশনকৃত খাবার কতটা স্বাস্থ্যসম্মত, তা যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকি এবং ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকলে খাবারের মান অনেকটাই উন্নত হতো।

গ্রিন রোড থেকে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা সৈকত আলী নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, পরিবার নিয়ে হাঁসের মাংস, চাপটি ও রুমালি রুটি খেয়েছি। তবে খাবারে অতিরিক্ত ঝাল থাকায় সন্তানকে মাংসের ঝোল দিতে পারিনি। খোলা জায়গায় খাবার পরিবেশন এবং চারপাশের ধূলিবালির কারণে সুন্দর মুহূর্তটির মাঝেও এক ধরনের উদ্বেগ কাজ করছিল।
খাদ্য প্রস্তুতপ্রণালি নিয়ে নানামুখী অভিযোগের চিত্র উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে মাংস গরম পানিতে ফেলে রাখা, বার বার বাসি খাবার গরম করা এবং রুচি বাড়াতে মাত্রাতিরিক্ত মসলা, কৃত্রিম রঙ, ফ্লেভার ও টেস্টিং সল্ট ব্যবহারের অভিযোগ করছেন অনেক ক্রেতা। এসব রাসায়নিক উপাদানের অপব্যবহার রোধে নিয়মিত ল্যাব পরীক্ষার দাবি জানান পর্যটকরা।
অবশ্য এসব অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা। নিউ সকাল-সন্ধ্যা রেস্টুরেন্ট'-এর মালিক বিল্লাল হোসেন বলেন, আমরা কোনো ধরনের টেস্টিং সল্ট, ফুড কালার বা ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করি না। সম্পূর্ণ দেশি হাঁস সংগ্রহ করে নিজস্ব বাটামসলা, আদা, রসুন ও গরম মসলা দিয়ে প্রতিদিনের খাবার সেদিনই রান্না করা হয়।
একই সুর 'পি কে হাউজ রেস্টুরেন্ট'-এর ব্যবস্থাপকের কণ্ঠেও। তিনি জানান, এখানে বাসি খাবার পরিবেশনের কোনো সুযোগ নেই। টেস্টিং সল্টের বদলে আমরা ঘরে তৈরি প্রাকৃতিক মসলা ব্যবহার করি। আর হাঁসের চামড়া পরিষ্কারের সময় নিয়ম মেনেই গ্যাসের আগুনে হালকা আঁচ দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর মাতিন বলেন, রেস্তোরাঁ ও খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমরা নিয়মিত পরিদর্শন চালাই। কোনো ত্রুটি বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে খাবার ধ্বংসসহ জড়িতদের সতর্ক করা হয়। তবে বিশাল এই এলাকায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পর্যাপ্ত জনবল ও নিরাপত্তাকর্মীর সংকট রয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিভ জুবায়ের জানান, পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পূর্বাচল অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও কিছু রেস্তোরাঁর পরিবেশ ও খাবারের মান সত্যিই উদ্বেগজনক। পুরো উপজেলায় মাত্র একজন স্যানিটারি কর্মকর্তা থাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিক্রেতাদের মাঝে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
পূর্বাচলের এই সুবিশাল খাবারের বাজারকে কেন্দ্র করে যেমন প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হচ্ছে, তেমনি সৃষ্টি হয়েছে অনেকের কর্মসংস্থান। তবে স্বাদের এই জনপ্রিয়তা যেন সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়—সেজন্য খাবার ঢেকে রাখা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে রান্না, নিরাপদ পানির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিংয়ের জোরালো দাবি জানান আগত ভোজনরসিকরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









