দেশজুড়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরো এক হাজার ৮৬৬ জন, একই সময়ে মারা গেছেন আরো ছয়জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০১ জনে এবং আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ৩৬৭ জনে। অন্যদিকে শিশুদের মাঝে হামের সংক্রমণও বাড়ছেই। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরো সাতজন ও আগের দিনের চারজনসহ নতুন করে ১১ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে রোগটির উপসর্গে। এ নিয়ে গত ১৯১ দিনে ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত হাম ও রোগটির উপসর্গে প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৬ জনে, যা তিন দশকের ইতিহাসে বিরল। তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত ছিল ১০১ জন এবং উপসর্গ নিয়ে বাকি ৯৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নতুন এক হাজার ২৭০ জন রোগীসহ রোগটি ও এর উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ চার হাজার ৩০০ জনে।
হামে সংক্রমণ বাড়ছেই
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত পরিসংখ্যানে বয়সভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায় না। রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে, তবে শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়। প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে যত মৃত্যু হচ্ছে, তার সবই হামে মৃত্যু বলে বিবেচনা করা হয়। সেই হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে গতকাল বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গে মারা গেছে সাতজন শিশু এবং তথ্য দেরিতে অসায় চারটি অপ্রকাশিত মৃত্যু যুক্ত হয়েছে তালিকায়। ওই ১১ জন শিশুর মধ্যে ঢাকা বিভাগেই মারা গেছে ছয়জন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে দুজন এবং সিলেট, রংপুর ও খুলনা বিভাগে একজন করে মারা গেছে। জেলা হিসেবেও ঢাকায় সর্বোচ্চ পাঁচজন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে এক হাজার ১৫৭ জন হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে আর নতুন করে রোগ শনাক্ত হয়েছে আরো ১১৩ জন শিশুর শরীরে। ফলে উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৮৩ হাজার ৪৪৯ জনে আর হাম শনাক্ত হয়েছে ২০ হাজার ৮৫১ জন শিশুর শরীরে। এ সময়ে রোগটির উপসর্গে আক্রান্ত এক হাজার ৬৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া এক হাজার ১০২ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে। সারাদেশে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এক লাখ ৬২ হাজার ৪৮ জন, যাদের এক লাখ ৫৫ হাজার ৬১২ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে হামের প্রকোপ শুরু হয়। পরে ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর তথ্য দিয়ে আসছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর থেকে গত ছয় মাস আট দিনে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ও আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গে ৫০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে ও আক্রান্ত হয়েছে ৯০ হাজার ৯৮০ জন শিশু। সর্বোচ্চ মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত ১৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া এই সময়ে রাজশাহী বিভাগে ৯৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮০ জন, বরিশাল বিভাগে ৭৯ জন, খুলনা বিভাগে ৪২ জন ও রংপুর বিভাগে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
২৬ জুন হাম ও হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু ৭০০ জন, ২২ জুলাই ৮০০ জন ও ১৫ আগস্ট ৯০০ জন ছাড়ায়। আর সব মিলিয়ে প্রাণহানির সংখ্যা এক হাজার পার হয় ৮ সেপ্টেম্বর। এদিকে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়ায় ৬ আগস্ট, এর মাত্র দেড় মাসের মাথায় দুই লাখ ছাড়িয়েছে ২০ সেপ্টেম্বর। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে যারা হাসপাতালে যাচ্ছে বা যাদের মৃত্যু হচ্ছে, তাদের সবার নমুনা পরীক্ষা করা হয় না। ফলে নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দিয়ে হামের বিস্তারের প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরো অবনতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু সংক্রান্ত বুলেটিনে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে গতকাল বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত ছয়জনের মধ্যে তাদের মধ্যে চারজন পুরুষ ও দুজন নারী। তাদের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের দুজন করে এবং বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগের হাসপাতালে একজন করে মারা গছেন। এ বছর মারা যাওয়া ২০১ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে ডিএনসিসি এলাকার হাসপাতালে। এরপর খুলনা বিভাগে ৩৪ জন, এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ২৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৯ জন, বরিশাল বিভাগে ১৬ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৬ জন, সিটি করপোরেশন বাদে ঢাকা বিভাগে ১২ জন, রংপুর বিভাগে চারজন এবং সিলেট বিভাগে একজন মারা গেছেন রোগটিতে। অন্যদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি নতুন এক হাজার ৮৬৬ রোগীর মধ্যে ঢাকা উত্তরের ১৭৩ জন ও দক্ষিণের ১৭৯ জন এবং দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের ৪০৫ জন রয়েছেন। এছাড়া খুলনা বিভাগে ২৮০ জন, বরিশাল বিভাগে ১৭৮ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩১৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১৩ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৫৬ জন, রংপুর বিভাগে ৫৯ জন এবং সিলেট বিভাগে আটজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সর্বশেষ একদিনে এক হাজার ৫৫৭ জনসহ এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৬২ হাজার ১১৭ জন। ২০১ জনের মৃত্যুর পর এখনো বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চার হাজার ৩৫৪ জন।
চলতি সেপ্টেম্বরের ২৩ দিনেই ডেঙ্গুতে মাসওয়ারী প্রাণহানি ও আক্রান্তের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গতকাল পর্যন্ত এ মাসে ১০৪ জনের মৃত্যু ও ২৯ হাজার ৮৩৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যা মাসের হিসাবে চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত মঙ্গলবার এক হাজার ৮৭২ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, যা দৈনিক হিসেবে চলতি বছরের সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তির রেকর্ড ছিল। এর আগে আগস্ট মাসে ২০ হাজার ৫৩৬ জন আক্রান্ত ও ৪৩ জন মারা গেছেন। এছাড়া গত জুন মাসে প্রাণ গেছে ১৩ জনের, আক্রান্ত হন দুই হাজার ৯০৭ জন আর নয় হাজার ২০৬ জন আক্রান্ত ও ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল জুলাইয়ে। এছাড়া মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
সারা দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। গত বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজারের মতো।
অসচেতন হলে জনগণকেও জরিমানা
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতন না হলে জনগণের বিরুদ্ধে জরিমানামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আব্দুস সালাম। তিনি জানান, শুধু সাধারণ জনগণই নয়, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকা দক্ষিণ সিটির কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা সংশ্লিষ্ট কারও অবহেলা প্রমাণিত হলে তাদেরও জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে।
গতকাল সকালে রাজধানীর রাজারবাগ এলাকায় রাস্তা দখলমুক্তকরণ কর্মসূচি, সরেজমিন পরিদর্শন এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রশাসক আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, জনগণ সচেতন হলে আগামী বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণে আসবে। এ সময় তিনি সড়ক ও ফুটপাতে যেখানে সেখানে নির্মাণসামগ্রী না রাখার কঠোর নির্দেশ দেন।
এদিকে রাজারবাগ এলাকায় পরিচালিত অভিযানের সময় একটি নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার প্রজনন উপযোগী পানি জমে থাকার প্রমাণ পায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় তাৎক্ষণিকভাবে ভবন কর্তৃপক্ষকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









