২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের চেয়ে কমিয়ে ৪ শতাংশ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। গত জুলাই মাসে দেওয়া পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি। এদিকে ঢাকার আশেপাশের শহরতলি এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করতে ২০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে এডিবি।
গতকাল বুধবার প্রকাশিত এডিবির সর্বশেষ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদন ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও)’ তথ্য অনুসারে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনৈতিক কার্যকর্ম ধীর হয়ে গিয়েছিল। তবে সংস্থাটি জানায়, এর প্রভাব সীমিত হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়েও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১০ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এলেও, জ্বালানি ঘাটতি, উচ্চ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় এবং খাদ্যের দামের ওপর এল নিনোর প্রভাবের কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। এ ছাড়া রপ্তানির তুলনায় আমদানির প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়ায় চলতি হিসাবের ঘাটতি (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট) জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দুর্যোগসহনশীল প্রবৃদ্ধিতে সহায়তাকারী শীর্ষস্থানীয় বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক এডিবি। সংস্থাটির মালিকানা ৬৯টি সদস্যের হাতে, যার মধ্যে রয়েছে এশিয়া অঞ্চলের ৫০টি সদস্য। এটি । সদস্য ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এডিবি উদ্ভাবনী আর্থিক উপকরণ ও কৌশলগত অংশীদারত্ব কাজে লাগায়। এর মাধ্যমে মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন, মানসম্মত অবকাঠামো নির্মাণ এবং পৃথিবী সুরক্ষায় কাজ করে সংস্থাটি।
এডিবি জানায়, ২০২৭ অর্থবছরে সেবা ও কৃষি খাত মূলত প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা সত্ত্বেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত থাকবে, যা বেসরকারি ভোগ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে এবং উচ্চতর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সঙ্গে মিলে বাহ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে। তবে উচ্চ ঋণগ্রহণের ব্যয়, ঋণের সীমিত প্রাপ্যতা, জ্বালানি ঘাটতি ও দুর্বল বাহ্যিক চাহিদার কারণে শিল্প ও বিনিয়োগ খাত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি তেলের উচ্চমূল্য, বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, ব্যাংকিং খাতে চাপ, রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব এবং জলবায়ু সংক্রান্ত ধাক্কা দেশের প্রবৃদ্ধির জন্য বড় ঝুঁকি (ডাউনসাইড রিস্ক) তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সার্বিক বিষয়ে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর কিয়াংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হতে শুরু করলেও এটি এখনও বাহ্যিক ধাক্কা ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কাছে অরক্ষিত। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে সংস্কার ত্বরান্বিত করার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বেসরকারি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করতে, মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করতে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিস্থাপক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে এসব সংস্কার অপরিহার্য।’ সংস্কারগুলোকে দেশের মানুষের জন্য দৃশ্যমান বা বাস্তব ফলাফলে রূপান্তরিত করতে এডিবি বাংলাদেশকে সমর্থন করতে প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি জানান।
বিদ্যুৎ বিতরণ আধুনিকায়নে ২০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন
এদিকে ঢাকার আশেপাশের শহরতলি এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করতে ২০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে এডিবি। এর মাধ্যমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পরিবারগুলোর জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, দক্ষতা ও দুর্যোগসহনশীলতা বাড়ানো হবে। বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ঢাকার আশেপাশের দ্রুত সম্প্রসারিত শিল্প ও শহরাঞ্চলে সেবা দেওয়া ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পিবিএস) বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো উন্নত করবে। এডিবির সহায়তায় পরিচালিত ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট উদ্যোগের আওতায় প্রকল্পটি অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত সাবস্টেশন, পুরনো অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সিস্টেমের ক্ষয়ক্ষতি এবং ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবেলায় সহায়তা করবে, যেগুলো বিদ্যুৎ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
এডিবির বাংলাদেশে কান্ট্রি ডিরেক্টর কিংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশ আরো সমৃদ্ধ, দুর্যোগসহনশীল ও বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রকল্পটি উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং অধিকতর দুর্যোগসহনশীলতার ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ঢাকার আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধি করিডোরগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে সহায়তা করবে। এর ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও জনগোষ্ঠী তাদের প্রয়োজনীয় নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ পাবে এবং সমৃদ্ধ হতে পারবে।
এ প্রকল্পের আওতায় ৫২টি সাবস্টেশনে এক হাজার ১৫০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার নতুন ট্রান্সফরমার সক্ষমতা স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান ১২টি সাবস্টেশনের সক্ষমতা ১১৫ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার বাড়ানো হবে। ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের বেশি ওভারহেড ও ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন নির্মাণ বা উন্নয়ন করা হবে। নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা, দক্ষতা ও নিরাপত্তা বাড়াতে ইনসুলেটেড কন্ডাক্টরও স্থাপন করা হবে। ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আধুনিকায়নের জন্য নদী পারাপারের বিদ্যুৎ সঞ্চালন কাঠামো ও সুইচিং স্টেশন নির্মাণ করা হবে। দ্রুত ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং বিদ্যুৎ সেবা পুনরুদ্ধারের জন্য ৯০০টি ফল্ট লোকেটর সেট স্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশ ২০২২ সালে সর্বজনীন বিদ্যুতায়ন অর্জন করেছে। তবে দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের ওপর চাপও ক্রমাগত বাড়ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগসহনশীল ও নিম্ন-কার্বন উন্নয়ন লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জোরদার হবে।
প্রকল্পটির জন্য এডিবির নির্দিষ্ট দুর্যোগসহনশীলতা অর্থায়নের পরিমাণ ১৪ কোটি ৬৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। এর আওতায় পরিবেশবান্ধব গ্যাস-ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার প্রযুক্তির মতো অভিযোজনমূলক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা দেওয়া হবে। উন্নত বিতরণ দক্ষতা এবং কারিগরি ক্ষতি কমানোর মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার ৭৫১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে। প্রকল্পের আওতায় বিআরইবি ও পিবিএসগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও জোরদার করা হবে। এ জন্য ডিজিটাল সিস্টেম একীভূতকরণ, সাইবার নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহনশীল পরিচালনা ব্যবস্থা, পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পিবিএসগুলোর আর্থিক স্থায়িত্ব শক্তিশালী করার মাধ্যমে বেসরকারি খাতের অধিকতর অংশগ্রহণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করা হবে। প্রকল্পটিতে নারী ও মেয়েদের প্রয়োজনের প্রতি সংবেদনশীল বিভিন্ন কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ উন্নত করার ব্যবস্থা থাকবে।
এডিবির সহায়তার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার ১০ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং বিআরইবি ১৪ কোটি ১৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার অর্থায়ন করবে। এডিবির ব্যবস্থাপনায় কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের ই-এশিয়া অ্যান্ড নলেজ পার্টনারশিপ ফান্ড থেকে ১০ লাখ ডলারের কারিগরি সহায়তা অনুদানও দেওয়া হবে। এই অর্থ প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, আর্থিক স্থায়িত্ব পরিকল্পনা এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









