চলতি সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া তিনটি আইন বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থাকে খর্ব করেছে। পাশাপাশি সংস্কারের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। এ অভিযোগ তুলে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, এসব আইনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ পরিচালনা করা অন্তর্বর্তী সরকার যে সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছিল, সেগুলো বাতিল কিংবা দুর্বল করা হয়েছে। এর ফলে অতীতে ব্যাপকভাবে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘন আবারও ফিরে আসা ঠেকানোর সুরক্ষা কমে গেছে।
এইচআরডব্লিউ বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে (এনএইচআরসি) শক্তিশালী করতে দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এর মধ্যে একটি অধ্যাদেশে গুম প্রতিরোধ, তদন্ত এবং এ ধরনের ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
তবে, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব এবং তদন্তের ক্ষমতা দুর্বল করতে নতুন আইন করেছে। তৃতীয় আইনটিতে আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করার কথা বললেও কার্যত শুধু বাহিনীটির নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিত পুলিশের ক্ষেত্রে যে ধরনের সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে, নতুন বাহিনীটির ক্ষেত্রে তার চেয়েও কম সুরক্ষা রাখা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলাইন পিয়ারসন বলেন, অতীতের ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন যেন আবার ফিরে না আসে, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের প্রকৃত নিরাপত্তা খাতের সংস্কার এবং অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা সম্পন্ন একটি স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা প্রয়োজন। হত্যা ও গুম অতীতের ঘটনা বলে নিরাপত্তা বাহিনীকে নজরদারি ও জবাবদিহির বাইরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন সরকারের প্রচেষ্টায় বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।
ইলাইন পিয়ারসনের দাবি, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, সমালোচকদের নির্বিচারে গ্রেফতার এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ। যদিও হত্যা ও গুমের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, তারেক রহমান সরকারও তার পূর্বসূরি সরকারের মতোই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত শত শত মানুষকে নির্বিচারে আটক করে রেখেছে বলে দাবি এইচআরডব্লিউ’র।
ইলাইন পিয়ারসন বলেন, ‘ব্যাপক ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী একটি সরকারকে উৎখাত করতে বিক্ষোভকারীরা জীবন বাজি রেখে আন্দোলন করার পর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান ক্ষমতায় এসেছিলেন। নতুন সরকার এত দ্রুত শেখ হাসিনার সরকারের নিপীড়নমূলক পথ অনুসরণ করছে-এটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক। কারণ এই পথ কোথায় নিয়ে যেতে পারে, তা আমরা আগেই দেখেছি।’
এইচআরডব্লিউ বলেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করেছিল। তবে, সংস্থাটির স্বাধীনতার ঘাটতি ছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতাও ছিল না। সে সময় কার্যকর আইনের অধীনে সরকার বা সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের প্রাধান্য থাকা একটি কমিটি সংগঠনের কমিশনারদের নিয়োগ দিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পেলে এনএইচআরসি কেবল সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাওয়ার এবং সুপারিশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখত। অন্তর্বর্তী সরকার এনএইচআরসিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা, কমিশনার নিয়োগে আরও স্বাধীন প্রক্রিয়া এবং অর্থ ও জনবল ব্যবস্থাপনায় আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
প্রথমবারের মতো জাতীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও (ন্যাশনাল প্রিভেন্টিভ মেকানিজম—এনপিএম) চালু করা হয়েছিল। নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকলের আওতায় এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আটককেন্দ্র পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ তৈরি হয়। তবে, ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। বিএনপি সরকার অধ্যাদেশটি কার্যকর রাখেনি। এরপর ৬ সেপ্টেম্বর সংসদে বিরোধী আইনপ্রণেতাদের ওয়াকআউটের মধ্যেই নতুন আইনটি পাস হয়। এই আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা এনএইচআরসিকে দেওয়া হয়নি। কমিশন কেবল যে সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে।
তবে, একটি অস্পষ্ট বিধান অনুসারে, সংশ্লিষ্ট সংস্থা জবাব না দিলে বা তাদের প্রতিবেদন অসন্তোষজনক মনে হলে এনএইচআরসি নিজস্ব তদন্ত শুরু করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে।
এইচআরডব্লিউ’র দাবি, নতুন আইনে কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় সরকারের নিয়ন্ত্রণও পুনর্বহাল করা হয়েছে। একই সঙ্গে এনএইচআরসির বাজেট ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা কমানো হয়েছে এবং জাতীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মর্যাদা ও স্বাধীনতাও হ্রাস করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯ সালের আইনের অধীনে থাকা এনএইচআরসির মতোই বর্তমান সরকারের প্রণীত নতুন আইনটিও জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর তদন্তের ক্ষমতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং পর্যাপ্ত সম্পদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক ন্যূনতম মানদণ্ড-প্যারিস নীতিমালা পূরণ করে না বলে মনে করছে এইচআরডব্লিউ।
৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’-ও পাস করে। এর মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি অধ্যাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাতিল করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ওই অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা এনএইচআরসিকে দেওয়া হয়েছিল। নতুন আইনে সেই ক্ষমতা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন গুমের অভিযোগ তদন্ত করবে সরকার মনোনীত এমন একটি নিরাপত্তা সংস্থা, যে সংস্থা অভিযোগের সঙ্গে জড়িত নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে এনএইচআরসিকে আটককেন্দ্র পর্যবেক্ষণ, পরিদর্শন ও তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। এমনকি কোনো গোপন আটককেন্দ্র থাকার সন্দেহ হলেও তা নিয়ে কাজ করার কথা বলা হয়েছিল । নতুন আইনে এসব ক্ষমতা বাদ দেওয়া হয়েছে।
গুমের ক্ষেত্রে কমান্ডের দায়িত্বের আইনি মানদণ্ডও পরিবর্তন করা হয়েছে। আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধির ভিত্তিতে কোনো কমান্ডিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন পরিস্থিতিতেও দায় নির্ধারণ করা যেত, যখন তিনি লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতেন বা জানার কথা ছিল এবং তা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হন। নতুন আইনে কোনো কমান্ডিং কর্মকর্তাকে গুমের জন্য দায়ী করতে তার সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণ প্রয়োজন হবে।
১০ সেপ্টেম্বর সংসদ ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন’ পাস করে। এর মাধ্যমে র্যাবের নাম পরিবর্তন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) করা হয়েছে। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে ভূমিকার কারণে র্যাবের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। র্যাবের সাবেক সাতজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এ ছাড়া বাহিনীটির কয়েকজন সাবেক সদস্য গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, ক্ষমতাসীন বিএনপি এর আগে র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচও র্যাব বিলুপ্ত করার আহ্বান জানিয়েছিল। নতুন আইনে র্যাবের সদস্য, ক্ষমতা ও সম্পদ-এর মধ্যে নথিপত্রও-একটি কথিত নতুন বাহিনী এসআরবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসআরবি ১৬ সেপ্টেম্বর কার্যক্রম শুরু করেছে। এমনকি বাহিনীটির লোগোও একই রয়েছে; শুধু সেখানে ‘RAB’-এর পরিবর্তে ‘SRB’ লেখা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, মে মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, বাহিনীর নাম পরিবর্তন করলে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করতে পারে। তবে, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা নতুন আইনে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা, প্রশিক্ষণ, তদারকি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংস্থাটির ভাষ্য, জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা উচিত, যেন নতুন আইনের অধীনে এসআরবির কার্যক্রমের জন্য এখনো প্রণীত না হওয়া বিধিমালায় কঠোর মানবাধিকার যাচাই, স্বাধীন বাহ্যিক তদারকি, গ্রেফতার ও আটকের ক্ষেত্রে সুরক্ষা, র্যাবের নথি ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ এবং বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়মিতভাবে সামরিক সদস্যদের প্রেষণে নিয়োগ বন্ধের বিধান রাখা হয়। সংস্থাটি আরও বলেছে, মানবাধিকার ও অতীতের লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নাম পরিবর্তন করা বাহিনীটির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যসহ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরও দেশটির নতুন সরকারের উদীয়মান মানবাধিকার পরিস্থিতি ও নীতির বিষয়ে জোরালো উদ্বেগ প্রকাশ করা উচিত বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









