জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিক অসত্য ও বিভ্রান্তিকর দাবি করেছেন। মঙ্গলবারের ওই ভাষণে তিনি যুদ্ধ বন্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ, সামরিক অস্ত্রের মজুত এবং ওয়াশিংটন ডিসির অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে নানা দাবি করেন।
সিএনএনের ফ্যাক্টচেকে এসব দাবির অধিকাংশকেই অসত্য বা উল্লেখযোগ্যভাবে অতিরঞ্জিত বলা হয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভাষণে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘আটটি যুদ্ধ’ বন্ধ করার দাবি করেছেন। এর মধ্যে কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড, কসোভো-সার্বিয়া, রুয়ান্ডা-গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ভারত-পাকিস্তান, আর্মেনিয়া-আজারবাইজান এবং গাজার যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেন। এর আগে মিসর-ইথিওপিয়া এবং ইসরাইল-ইরানের সংঘাতকেও ওই তালিকায় রেখেছিলেন তিনি। তবে সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে বিরোধটি ছিল ইথিওপিয়ার বাঁধ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক বিরোধ, যুদ্ধ নয়।
একইভাবে কসোভো ও সার্বিয়ার মধ্যেও ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদে কোনো যুদ্ধ হয়নি। রুয়ান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সংঘাতও পুরোপুরি শেষ হয়নি। গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইসরাইল ও ইরানের ২০২৫ সালের স্বল্পস্থায়ী সংঘাত থামাতে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা ছিল। তবে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আবার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে।
জলবায়ু নিয়ে দাবি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতাকে খাটো করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, একই লোকেরা একসময় বলেছিল বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে। তার দাবি ছিল, পরে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’-এর নাম বদলে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ করা হয়েছে, কারণ পৃথিবী উষ্ণ না হয়ে ঠান্ডা হচ্ছিল। সিএনএনের ফ্যাক্টচেক অনুযায়ী, এই বক্তব্যের একাধিক অংশই ভুল। ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ ও ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’- দুটি শব্দই বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে অর্থ এক নয়। দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে বোঝাতে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ এবং এর বিস্তৃত প্রভাব বোঝাতে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শব্দটি বেশি ব্যবহৃত হয়।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর ছিল রেকর্ডের উষ্ণতম ১১ বছর। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ ছিল সবচেয়ে উষ্ণ তিন বছর। ফলে পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সঙ্গে তাপমাত্রার রেকর্ডের মিল নেই। ২০১৮ সালের একটি বহুল আলোচিত জলবায়ু প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার সম্ভাবনা বজায় রাখতে পরবর্তী ১২ বছরের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ব্যাপকভাবে কমানো প্রয়োজন। সেখানে ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে এমন কোনো দাবি করা হয়নি।
২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের দাবিও প্রশ্নের মুখে
ট্রাম্প জাতিসংঘে বলেন, তার প্রশাসন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেছে। তবে এই অঙ্কের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি পাওয়া যায়নি বলে সিএনএনের ফ্যাক্টচেকে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষণের সময় হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে তার দ্বিতীয় মেয়াদে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা হিসেবে ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের কথা বলা হয়েছিল। সেই হিসাবেও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানির ঘোষণা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিশ্রুতি এবং সরাসরি বিনিয়োগ নয় এমন বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অস্ত্রের মজুত নিয়েও বিতর্ক
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত এত বেশি যে তা কখনো পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব নয় এবং নজিরবিহীন মাত্রায় নতুন অস্ত্র তৈরি হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক দুটি সরকারি প্রতিবেদনে কিছু ধরনের মার্কিন অস্ত্রের মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের প্রতিবেদনে যুদ্ধের কারণে কিছু অস্ত্রের কৌশলগত মজুত ঘাটতি এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় বাধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতির কথা জানিয়েছে এবং মজুত পুনর্গঠনে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে উল্লেখ করেছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ দেশটির সামগ্রিক অস্ত্রভাণ্ডারে ঘাটতির দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ওয়াশিংটনে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমার দাবি
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় শহরটি অপরাধে জর্জরিত ছিল, কিন্তু এখন অপরাধ প্রায় পুরোপুরি কমে এসেছে। তবে স্থানীয় পুলিশ বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সোমবার পর্যন্ত ওয়াশিংটনে ১৫ হাজারের বেশি অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ের ২০২৪ সালের তুলনায় মোট অপরাধ কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ-৮৭ শতাংশ নয়। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। হোয়াইট হাউস এর আগে ট্রাম্পের বড় ধরনের অপরাধ কমার দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরেছিল। এর মধ্যে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ও হত্যাকাণ্ডের হার কমার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এসব নির্দিষ্ট অপরাধের হ্রাসের হার সামগ্রিক অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমার দাবিকে সমর্থন করে না।
জাতিসংঘে ট্রাম্পের ৩৭ মিনিটের ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ইউক্রেন সংঘাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অভিবাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়েও বিস্তৃত বক্তব্য আসে যার বেশিরভাগই প্রশ্নবিদ্ধ!


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









