রাজপথে সাম্প্রতিক কর্মসূচিগুলোতে সরকারের বিরুদ্ধে এক দফার আন্দোলনে যাওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে সংসদে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে দলের ভেতরের খবর ভিন্ন। সরকারের বিরুদ্ধে এখনই সর্বাত্মক আন্দোলনে না গিয়ে ধীরে এগোতে চায় দলটি। বিরোধী দল হিসেবে সংসদে সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা এবং রাজপথে জনদাবি নিয়ে কর্মসূচি অব্যাহত রাখলেও আপাতত সরকার পতনের মতো চূড়ান্ত কর্মসূচিতে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক দলটি। তারা বরং সরকারকে তিন বছরের সময় দিতে চায়।
সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ এবং বিরোধী দলের সাংগঠনিক ভিত্তি আরো শক্ত করার জন্য সরকারকে কয়েক বছর সময় দেওয়ার একটি কৌশল নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে। এ আলোচনায় প্রায় তিন বছর সময় দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে তিন বছর সময় দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা প্রকাশ্য ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি আপাতত দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আলোচনা ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জামায়াতের এই হিসাবের অন্যতম কারণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। তাদের আশঙ্কা, সরকার গঠনের পরপরই বিরোধী দল যদি বড় ধরনের সরকারবিরোধী আন্দোলনে যায় এবং রাজপথে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তৈরি হয়, তাহলে তার সুযোগ অন্য রাজনৈতিক পক্ষ নিতে পারে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে জামায়াতের একটি অংশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে সূত্রগুলোর দাবি।
এ কারণে সরকারের মেয়াদের শুরুতেই সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে কিছুটা সময় অপেক্ষা করে সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের পক্ষে দলের একটি অংশ। তাদের যুক্তি, অর্থনীতি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সরকারের বাস্তব সক্ষমতা যাচাই করতে সময় প্রয়োজন।
জামায়াতের অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা সূত্রগুলোর মতে, তিন বছর সময় দেওয়ার চিন্তাটি সরাসরি সরকারকে রাজনৈতিক ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা নয়। বরং সরকারকে কাজ করার সুযোগ দিয়ে পরবর্তী সময়ে তার সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরাই এর উদ্দেশ্য।
এ সময়ে সংসদে সরকারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজন হলে সমালোচনা এবং বিকল্প প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি রাজপথেও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ জামায়াতের কৌশল হতে পারে- সরকারকে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ দেওয়া, কিন্তু সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ পুরোপুরি তুলে না নেওয়া।
এ কারণে জামায়াতের বর্তমান অবস্থানকে সরাসরি সরকারপন্থী কিংবা সরকারবিরোধী- কোনো একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। সংসদে জাতীয় স্বার্থে সহযোগিতার কথা বলার পাশাপাশি জনগণের দাবি আদায়ে আন্দোলনের অধিকারও ধরে রাখতে চাইছে দলটি। জামায়াতের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও কর্মসূচিতে এই দ্বৈত অবস্থানের প্রকাশ্য ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে।
চলতি মাসের ৪ তারিখে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ১১ দলীয় জোটের লংমার্চকে সরকার পতনের কর্মসূচি হিসেবে অভিহিত না করে বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জনদুর্ভোগ দূর করার দাবিতে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক কর্মসূচি হিসেবে এই লংমার্চ করা হচ্ছে।
আবার ১৭ সেপ্টেম্বর ১১ দলীয় জোটের বৈঠকে ১৯ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ এবং সাত দফা দাবিতে আন্দোলন আরো গতিশীল করার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
অন্যদিকে ১২ সেপ্টেম্বর জামায়াতের আমির ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতির প্রয়োজনে সরকার চাইলে বিরোধী দল যেকোনো সময় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়ার কথাও তিনি জানান। ফলে সংসদে সহযোগিতার বার্তা এবং রাজপথে দাবিভিত্তিক কর্মসূচি- দুটি পথই একই সঙ্গে ধরে রাখতে চাইছে জামায়াত।
দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলোর মতে, সরকারের প্রথম কয়েক বছরের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের জন্য একটি বাস্তবসম্মত সময় প্রয়োজন। বিশেষ করে অর্থনীতি পুনর্গঠন, প্রশাসনিক সংস্কার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া কঠিন। তাই সরকারের কাজের ফলাফল মূল্যায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দেওয়ার ধারণা সামনে এসেছে।
এ ক্ষেত্রে তিন বছর সময় পার হওয়ার পর পরিস্থিতি নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে। সরকার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলে বিরোধী দল হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা অব্যাহত রাখার সুযোগ থাকবে। আর সরকারের কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের ব্যর্থতা থাকলে সেটিকে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে আনার সুযোগ তৈরি হবে—এমন হিসাবও রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
জামায়াতের এই কৌশলের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে রাজনৈতিক সূত্রগুলো আওয়ামী লীগের বিষয়টি সামনে আনছে।
সূত্রগুলোর দাবি, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এখনই বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হলে এবং দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন শুরু হলে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কা জামায়াতের একটি অংশের মধ্যে রয়েছে।
সরকারবিরোধী আন্দোলন যদি ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ সেখানে যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তারা মনে করছেন। এমন আশঙ্কা শুধু জামায়াতের অভ্যন্তরীণ আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ নেই। ১৯ সেপ্টেম্বর জামায়াতের লংমার্চ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও আওয়ামী লীগ এ ধরনের কর্মসূচির সুযোগ নিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছিল।
১৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন জামায়াতের লংমার্চের সমালোচনা করে বলেন, এ ধরনের কর্মসূচি আওয়ামী লীগকে মাঠে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তিনি জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোকে আওয়ামী লীগের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, লংমার্চের কারণে আওয়ামী লীগও মাঠে নামার সুযোগ খুঁজতে পারে। বক্তব্যে তিনি ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক আন্দোলনের উদাহরণও টেনে আনেন।
অর্থাৎ সরকারের পক্ষ থেকেও এখন প্রকাশ্যে একই ধরনের রাজনৈতিক আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে। যদিও জামায়াতের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনার কথা বলা হয়নি।
সঙ্গত কারণেই জামায়াতের এমন রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন, জাতীয় ইস্যুতে সরকারকে সহযোগিতার ঘোষণা এবং একই সঙ্গে রাজপথে চাপ সৃষ্টি—এই তিনটি পথ কি একই রাজনৈতিক কৌশলের অংশ? এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনীতির মাঠে। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে বলা হয়নি।
সরকারকে সময় দেওয়ার চিন্তা থাকলেও রাজপথ থেকে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই জামায়াতের। বরং দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, সংস্কার, বিচার এবং প্রশাসনে দলীয়করণসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে চায় দলটি।
১১ দলীয় জোটের ঘোষিত দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ বন্ধ এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ করা।
এসব দাবিকে জামায়াত বিরোধী দলের দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে রাজপথে কর্মসূচি থাকবে, কিন্তু আপাতত সেগুলোকে সরাসরি সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ না দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবেই দৃশ্যমান হচ্ছে।
ভিন্নমত দলেও
তবে জামায়াতের সবাই যে এই কৌশলের সঙ্গে একমত, এমনটিও নয়। দলের একটি অংশ মনে করছে, বিরোধী দল হিসেবে রাজপথের চাপ কমিয়ে দিলে সরকার প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেতে পারে। ফলে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
এই অংশের যুক্তি, বিরোধী দলের মূল শক্তি হচ্ছে সংসদের পাশাপাশি রাজপথ। তাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা কমে গেলে বিরোধী দলের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত সতর্ক অংশটির যুক্তি হলো—এখনই সরকার পতনের আন্দোলনে গেলে রাজনৈতিক সংঘাত বাড়তে পারে। তাতে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তৃতীয় কোনো রাজনৈতিক পক্ষ পরিস্থিতির সুবিধা নিতে পারে।
সব মিলিয়ে জামায়াতের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা; অন্যদিকে রাজপথে জনদাবি নিয়ে চাপ ধরে রাখা। এই দুইয়ের মাঝখানে সরাসরি সরকার পতনের আন্দোলনে না গিয়ে সরকারকে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার ধারণাটি দলের একটি অংশের মধ্যে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তিন বছর সময় দেওয়ার আলোচনা বাস্তবে দলীয় সিদ্ধান্তে পরিণত হয় কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ সরকারের প্রতি কতটা সহযোগিতা এবং কতটা রাজনৈতিক চাপ—এই ভারসাম্যই শেষ পর্যন্ত জামায়াতের বিরোধী রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।
জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম দৈনিক এদিনকে বলেন, “সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা ও প্রতিবাদ করা আমাদের দায়িত্ব। তাই আমরা গণতান্ত্রিক কর্মসূচি দিয়ে রাজপথে আছি। এতে যদি জনগণ সম্পৃক্ত হয়ে সরকার পতন আন্দোলন তরান্বিত করে, সেজন্য তো সরকারই দায়ী থাকবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









