তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও আইনটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ৭২.৪০% নাগরিক। তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিশোধ বা হয়রানির ভয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে তথ্য দিতে অনীহা বড় বাধা হয়ে আছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন তথ্য কমিশন কার্যকর না থাকায় তথ্য পাওয়ার আইনি প্রতিকারও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ‘ডেইলি স্টার ভবন’-এ তথ্য অধিকার ফোরাম আয়োজিত তথ্য অধিকার সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সারাদেশ থেকে সাংবাদিক, তথ্য অধিকারকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা, এনজিও ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সম্মেলনে ‘বাংলাদেশ তথ্য অধিকার জরিপ ২০২৬’ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ড. অনন্য রায়হান। তিনি জানান, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নাগরিকদের তথ্যের প্রয়োজন, সচেতনতা, তথ্য অধিকার আইন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা এবং তথ্য সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রায়হান বলেন, তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সচেতনতার প্রধান উৎস হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা বেড়েছে। বিপরীতে নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে কম। তথ্য সরবরাহকারী পক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাধারণ সচেতনতা থাকলেও আইনের বিস্তারিত ও সমন্বিত ধারণার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে।
রায়হান বলেন, তথ্য অধিকার আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল তথ্য পাওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতি কমানো ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু বড় ধরনের দুর্নীতি বা বড় প্রকল্পের অনিয়মের ক্ষেত্রে এ আইন কতটা ব্যবহার হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, নাগরিকদের তথ্যের চাহিদার বড় ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক সেবা, শিক্ষা, সরকারি উদ্যোগ, কৃষি ও সরকারি অর্থ বরাদ্দ। তবে ৭২.৪০% মানুষ মনে করেন, প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ নেই। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৬৮.৩০%। রায়হান বলেন, তথ্যের চাহিদা থাকলেও আইনটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘ফিয়ার অব রিটালিয়েশন’ বা প্রতিশোধের ভয় বড় বাধা। এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে বিস্তারিত তথ্য দিতে অনীহাও রয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য ও প্রবেশাধিকারের ঘাটতির শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের মধ্যস্থতাকারীর সহায়তা নিতে হচ্ছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতনতার হার ছিল ৭.৭%। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ১০.৫০% হয়েছে। শহরাঞ্চলে সচেতনতার হার ১২.৪০% এবং গ্রামাঞ্চলে ৯.৭০%।
তরুণদের মধ্যে এ হার প্রায় ১৮.৫০% এবং গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে প্রায় ৩৮ %। তবে আইন সম্পর্কে জানার সঙ্গে এর প্রয়োগ-পদ্ধতি জানার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। সচেতন নাগরিকদের মধ্যেও মাত্র ৮%-এর কিছু বেশি তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া জানেন। নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে জানেন ৯.৩%। আপিল কর্তৃপক্ষ সম্পর্কেও রয়েছে জ্ঞানের ঘাটতি। ৪৬% মনে করেন, ইউপি চেয়ারম্যান আপিলের বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন। মাত্র ১৯.৯০% সঠিকভাবে তথ্য কমিশনকে শনাক্ত করতে পেরেছেন।
এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, তথ্য কমিশন কার্যকর না থাকায় বর্তমানে সাড়ে ৮০০-এর বেশি শুনানি আটকে আছে। নতুন কমিশন গঠনের পর এসব ঝুলন্ত শুনানি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন আবেদন ও শুনানিও নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, তথ্য কমিশনারদের পদমর্যাদা বাড়ানো প্রয়োজন। কমিশনকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য তাঁদের পদমর্যাদা ক্যাবিনেট সচিবের ওপরে রাখার দাবি রয়েছে।
‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’-এর (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আগামীতে যে তথ্য কমিশন গঠিত হবে, সেটি স্বাধীন ও প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করবে, এমন প্রত্যাশা রয়েছে। দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ না হলে তথ্য কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হবে না। অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের পুনর্বাসনকেন্দ্র হিসেবেও কমিশনকে পরিণত করা উচিত নয়।
তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অপতথ্য, মিথ্যা তথ্য বা ভুয়া তথ্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়টির সঙ্গে তথ্য অধিকারকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে আলাদা আইন বা ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে এর নামে তথ্য অধিকার সংকুচিত করা হলে মানুষের জানার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তথ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়, এমনভাবে আইন সংশোধন করা উচিত নয়।
‘বাংলাদেশ আইনী সহায়তা ও সেবা সংস্থা’-র(ব্লাস্ট) অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ থাকলেও অপরাধ, বিচার ও অধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তথ্য জানার আগ্রহ জরিপে খুব একটা প্রতিফলিত হয়নি। এর পেছনে মানুষের ভয় বা ঝুঁকি নেওয়ার অনাগ্রহ থাকতে পারে। তিনি বলেন, প্রান্তিক, দরিদ্র ও ক্ষমতাহীন মানুষ তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করতে পারছেন না। অন্যায় বা অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার চাইতে গিয়ে দ্বিতীয়বার হয়রানি বা অধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা থাকলে মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পাবে।
সারা আরও বলেন, মাত্র ৪৯% দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রশিক্ষিত এবং ৬৪% কর্মকর্তা কোনো তথ্যের আবেদনই পাননি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তথ্যের আবেদন গ্রহণ ও জবাব দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, আইন সংস্কারের অপেক্ষায় না থেকে বিদ্যমান কমিশনকে দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন। আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে তথ্য কমিশন ছাড়া তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানুষ এক পর্যায়ে এসে আটকে যাচ্ছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও বড় ঘাটতি রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ৩৮% সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় নি।
‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর (এমজেএফ) নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের পর জনগণের মধ্যে তথ্য চাওয়ার আগ্রহ যতটা বাড়ার কথা ছিল, তা হয়নি। ২০১৯ সালের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও তা যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ৬৪% দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনো তথ্যের আবেদন পান নি।
তিনি বলেন, এনজিওগুলোর প্রকল্পের মাধ্যমে জনগণকে তথ্য চাইতে উদ্বুদ্ধ করা হলে ভালো ফল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তথ্য পাওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতায়িত ও আত্মবিশ্বাসী হয়েছে। তাই তথ্য চাওয়ার প্রবণতা বাড়াতে জনগণের মধ্যে সচেতনতা ও আগ্রহ তৈরি করতে হবে।
দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার বা বড় প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তথ্য অধিকার আইন যথেষ্ট ব্যবহার হয়নি উল্লেখ করে আনাম বলেন, এর পেছনে বড় কারণ ভীতি। স্থানীয় পর্যায়েও অভিভাবক, এনজিও ও নাগরিক সংগঠনগুলো তথ্য চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা নিজেদের ক্ষতির আশঙ্কা করে।
‘তথ্য কমিশন বাংলাদেশ’-এর সচিব মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, একসময় দেশে তথ্যের সংকট ছিল, এখন তথ্যের আধিক্য দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্যের বিস্তার জনজীবন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য সমস্যা তৈরি করছে। ফলে এখন মানুষের দাবি হচ্ছে যাচাই করা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া। তিনি বলেন, তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে অগ্রগতি হলেও এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে। জনগণ যতক্ষণ তথ্য চাইবে না এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি তুলবে না, ততক্ষণ আইনটি পুরোপুরি কার্যকর হবে না। তথ্য সরবরাহের পাশাপাশি তথ্যের চাহিদার দিকটিও শক্তিশালী করতে হবে।
এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর পরিচালক ড. কে. এম. মামুনুজ্জামান বলেন, সুশাসনের মূল ভিত্তি জনগণের তথ্য জানার অধিকার। সরকারি দপ্তরগুলো স্বপ্রণোদিতভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করলে নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার অধিকার আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে তথ্য সহজলভ্য করার পাশাপাশি নাগরিকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা, ই-গভর্ন্যান্স ও স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের গুরুত্ব এবং তথ্য অধিকার আইন, এনজিও কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি ও স্থানীয় ব্যবস্থায় সুশাসন নিয়ে আলোচনা হয়। এতে তথ্য কমিশন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









