দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারত বাণিজ্য ও কনস্যুলার-বিষয়ক জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (যৌথ কার্যনির্বাহী দল) এক বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে বাণিজ্যবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক ৮ ও ৯ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কনস্যুলার-বিষয়ক জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকটি ঢাকায় আয়োজনের জন্যও দুই দেশ তারিখ নির্ধারণের কাজ করছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানান—বাণিজ্যবিষয়ক জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে অংশ নিতে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল বুধবার নয়াদিল্লি যাওয়ার কথা। এর আগে মঙ্গলবার প্রতিনিধিদলের যাওয়ার কথা ছিল এবং বৈঠকটি ৭ ও ৮ অক্টোবর হওয়ার কথা ছিল। তবে লজিস্টিক বা যাতায়াত-সংক্রান্ত কারণে প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার যেতে না পারায় বৈঠকের সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় করার অংশ হিসেবে এসব বৈঠক আয়োজন করা হচ্ছে। তবে বাণিজ্য ও কনস্যুলার বৈঠকের পাশাপাশি ট্রানজিট, সীমান্ত বাণিজ্যসহ আরও কিছু বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ চেয়েছিল, বাণিজ্যবিষয়ক জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকের পর দুই দেশের বাণিজ্যসচিবদের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হোক। তবে ভারতীয় পক্ষ ঢাকাকে জানিয়েছে, ট্রানজিট ও সীমান্ত বাণিজ্যের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করা অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বৈঠক শেষ হওয়ার পর বাণিজ্যসচিবদের বৈঠক আয়োজন করা সম্ভব হবে।
কনস্যুলার-বিষয়ক জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ভিসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের কারণে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দুই দেশই ভিসাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সমাধানের চেষ্টা করছে। এসব প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবে একই সময়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কয়েকটি বিষয় নিয়ে দুই দেশকে কাজ করতে হচ্ছে।
এর আগে, ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ভারত দুই দেশের সম্পর্ক মেরামতের উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায় ভারত। তবে বাংলাদেশ গত মাসে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেয়নি।
একই সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের তারিখও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সময় নির্ধারণে ভারতের ব্যস্ত কূটনৈতিক সূচিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অক্টোবরে ভারতীয় পক্ষ সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গাই পারমেলিন এবং পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের সফর নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। নভেম্বরে ১৬ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত ফিলিপাইনে আসিয়ান সম্মেলনে অংশ নিতে যাবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ডিসেম্বরেও মোদির ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সফরসূচি রয়েছে। ওই মাসে তাঁর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও বেলজিয়াম সফরের কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, তারেক রহমানের অক্টোবরে জাপান এবং নভেম্বরে তুরস্ক ও সৌদি আরব সফরের কথা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠকগুলো আয়োজনের উদ্যোগ চললেও তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
বিক্রম মিশ্রির সঙ্গে রিয়াজ হামিদুল্লাহর বিদায়ী সাক্ষাৎ
এদিকে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ। মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই বিদায়ী সাক্ষাৎ হয় বলে এক এক্স পোস্টে জানিয়েছে বাংলাদেশ হাইকমিশন।
পোস্টে বলা হয়, বিদায়ী সাক্ষাতে দুই কূটনীতিক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন দিক এবং দুই দেশের বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। তারা দুই দেশের মানুষের মধ্যে ‘বহুমুখী যোগাযোগের’ গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন এবং অভিন্ন স্বার্থে যৌথ উদ্যোগ আরও অর্থবহ ও কার্যকর সহযোগিতা তৈরি করবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
এর আগে রবিবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গেও বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন রিয়াজ হামিদুল্লাহ। জয়শঙ্কর এক পোস্টে তার ভূমিকার প্রশংসা করে ভবিষ্যৎ দায়িত্বের জন্য শুভকামনা জানান।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন পেশাদার কূটনীতিক রিয়াজ হামিদুল্লাহ। ভারতে দায়িত্ব পালন শেষে সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় জাতিসংঘ দপ্তরে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিতে যাচ্ছেন তিনি। ১৯৯৫ ব্যাচের পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা রিয়াজ হামিদুল্লাহ এর আগে নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং শ্রীলঙ্কায় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনে রিয়াজ হামিদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন আসাদ আলম সিয়াম, যিনি বর্তমানে পররাষ্ট্রসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। ভারত সরকার ইতোমধ্যে সিয়ামকে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিয়েছে। শিগগিরই তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









