ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।আইএমএফের মতে, ঢালাও ভর্তুকির বড় অংশ অনেক সময় দরিদ্রদের পরিবর্তে বেশি ভোগক্ষমতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়। ফলে সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যে নির্বিচারে ভর্তুকি না দিয়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
গতকাল বুধবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী বৈঠকের তৃতীয় দিনে ‘ফিসক্যাল মনিটর’ বিষয়ক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন- আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস, উপ-পরিচালক এরা দাবলা-নরিস এবং বিভাগের ডিভিশন চিফ ডেভিডে ফুরচেরি। ব্রিফিংয়ে যোগাযোগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন থিলেন পাভিস দেবাহাসাদিন।
এদিকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রাপ্তি কম তাই চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে যৌথ ও সরাসরি বিনিয়োগের দিকে যেতে চায় বাংলাদেশ।
আইএমএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো রাজস্ব আয় বাড়াতে পারে। তবে কর সংস্কার ও ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। বিশ্লেষণে আরো বলা হয়েছে, কর প্রশাসন সহজ ও কার্যকর করা গেলে কর আদায়ের ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানো সম্ভব। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কর পরিপালন সহজ করা হলে ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার মধ্যে ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে আইএমএফ। সংস্থাটির বিশ্লেষণে মরক্কোর উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশটি সর্বজনীন ভর্তুকি ব্যবস্থা থেকে সরে এসে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি সামাজিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
ঋণ সংকটে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তারল্য সহায়তা, ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো এবং ঋণ পুনর্গঠনকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করছে আইএমএফ। এক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা হিসেবে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। আইএমএফের সুপারিশ অনুযায়ী, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শুধু ব্যয় কমানো বা ভর্তুকি প্রত্যাহার যথেষ্ট নয়; বরং রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।
চীনের সঙ্গে ঋণ নয়, যৌথ বিনিয়োগে যেতে চায় বাংলাদেশ
চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে যৌথ ও সরাসরি বিনিয়োগের দিকে যেতে চায় বাংলাদেশ। এমন মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে এ কথা বলেন তিনি। আলোচনায় চীনের সঙ্গে যেসব বিনিয়োগ উদ্যোগ নেওয়া হবে, সেগুলোতে ঋণের পরিবর্তে অংশীদারত্বভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে অর্থায়নের কাঠামোয় পরিবর্তন আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সার্বভৌম ঋণ ও অন্যান্য ঋণভিত্তিক অর্থায়নের ওপর যে নির্ভরতা রয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে ইকুইটি বা মালিকানাভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে দু’দেশের অংশীদারত্ব জোরদার করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা ঋণ থেকে সরে এসে ক্রমান্বয়ে বিনিয়োগের দিকে বেশি যাচ্ছি। এক্সিম ব্যাংকের (চায়না) সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। আমরা আশা করি, এক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে।
আমেরিকা থেকে প্রাপ্তি কম
এদিকে, অপর এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নয়ন এবং দেশটি থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের আরও সহায়তা পাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈঠকে ঋণ ব্যবস্থাপনা, মার্কিন সহায়তা এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিম ব্যাংক এবং দেশটির সহায়তাসংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিগত দিনে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেমন কিছু পাইনি। কিন্তু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে; আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেকগুলো এয়ারক্রাফট কিনছি, তেল, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য ও কমোডিটি আমদানি করছি। তাই তাদের কাছ থেকে আমাদের জন্য বাড়তি সহায়তা আসা উচিত। তারা এ বিষয়ে একমত হয়েছে। এখন দেখা যাক।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









