দেশে ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৯৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিদিন সড়কে প্রাণ গেল ৩ জনের বেশি শিশু। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২,৯৫৮ শিশু নিহত হয়েছে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে। এ ছাড়া পথচারী হিসেবে ২ হাজার ৮১২ এবং বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে ২,১৯৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
গতকাল বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে ’রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’। সংস্থাটি ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
এদিকেদেশে গত ১৩ বছরে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। সড়ক পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও ভুলনীতির কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের মধ্যে ৩৫.৩১% ছিল পথচারী। পথচারী শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১,২৭১ জন নিহত হয়েছে থ্রি-হুইলারের ধাক্কায়। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের চাপায় বা ধাক্কায় প্রাণ গেছে ১,১২৬ শিশুর। এ ছাড়া প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় ৩১৭ এবং মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ৯৮ শিশু নিহত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে ২,৫১৩ শিশু নিহত হয়েছে। আর বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলার সময় প্রাণ গেছে ৯৬২ শিশুর।
সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিহত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২,৭১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে গ্রামীণ সড়কে, যা মোট মৃত্যুর ৩৪.০৭%। আঞ্চলিক সড়কে ২ হাজার ৮২, মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ এবং শহরের সড়কে ১,১৯৪ শিশু নিহত হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিকেলে সবচেয়ে বেশি ২,৬৩৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সকালে নিহত হয়েছে ২ হাজার ১৬৮, দুপুরে ১ হাজার ৮১৩, রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশু। বয়সভিত্তিক হিসাবে, ১৩-১৭ বছর বয়সী ৩,৫৪৭ শিশু নিহত হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৪৪.৫৪%। ৬-১২ বছর বয়সী ২,৮৮৪ এবং ০-৫ বছর বয়সী ১,৫৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা শিশুবান্ধব না হওয়া, নিরাপদে সড়ক ব্যবহারে সচেতনতার অভাব, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ না দেয়া, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের যানবাহন চালানো এবং দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের চিকিৎসাসংকট মৃত্যুর হার বাড়ার অন্যতম কারণ। সংস্থাটি শিশুদের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা নিরাপদ করা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানো এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসাসেবা বাড়ানো, চিকিৎসার জন্য বিশেষ সরকারী তহবিল গঠন এবং সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
১৩ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষের
এদিকে দেশে গত ১৩ বছরে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। সড়ক পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও ভুলনীতির কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে গতকাল বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এসব তথ্য তুলে ধরেন সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যবেক্ষণ করে দুর্ঘটনা, হতাহত ও এর কারণ সম্পর্কে এসব পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। তবে দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
সড়ক কেন্দ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থাকে দায়ী
যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, স্বাধীনতার পর থেকে নৌ ও রেলপথের ব্যবহার বাড়িয়ে সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে একের পর এক সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এতে মানুষের যাতায়াতের ওপর সড়কের নির্ভরতা বেড়েছে। অথচ সেই তুলনায় উন্নত গণপরিবহন ও সমন্বিত যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা উপেক্ষা করে সড়ককেন্দ্রিক উন্নয়ন এবং রেল ও নৌপথ সংকুচিত করার নীতির কারণে সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। বিগত সরকারের নীতিগত ভুল, অনিয়ম ও দুর্নীতিও সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনা, মালিক-শ্রমিক ও কিছু পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক, সড়ক নির্মাণের ত্রুটি এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে।
সাড়ে ৬ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে প্রায় ৮ হাজার শিশুর
দুর্ঘটনার ছয়টি প্রধান কারণ
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে সড়ক দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে— ১. দেশে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বেপরোয়া বৃদ্ধি ও অবাধে চলাচল। ২. সড়কে মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডার না থাকা, সড়কে গাছপালায় অন্ধবাঁকের সৃষ্টি। ৩. মহাসড়কের নির্মাণ ক্রটি, যানবাহনের ক্রটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করা।
৪. উল্টোপথে যানবাহন, সড়কে চাদাঁবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন। ৫. অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রীবহন। ৬. বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যাত্রী কল্যাণ সমিতির ১০টি সুপারিশ হলো
সড়কে হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএ আমলাদের পরিবর্তে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা জরুরি।
সারাদেশে উন্নত বিশ্বের আদলে প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
প্রযুক্তি নির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
চালকদের উন্নত প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে লাইসেন্সপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাতসহ সার্ভিস লেইনের ব্যবস্থা করা।
কাঠামোগত সংস্কার করে সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা।
মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা, রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করা।
মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেইফটি অডিট করা।
ফিটনেস প্রদান পদ্ধতি আধুনিকায়ান, মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন স্ক্র্যাপ করা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানো, ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









