শঙ্খনাদ, উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্যি আর ধূপ-ধুনোর সুবাসে মুখরিত পরিবেশকে বিসর্জনের বিষাদে ভাসিয়ে ‘দুর্গতিনাশিনী’ দেবী দুর্গার আরাধনা হল দশমীর সকালে। বিজয় দশমীতে গতকাল বুধবার রাজধানীর মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর পাদপদ্মে সধবা নারীদের সিঁদুর ছোঁয়ানো, অঞ্জলি দান এবং নারীদের সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে দুর্গাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানো হয়। দশমীর বিহিত পূজা এবং দর্পণ বিসর্জনে শেষ হয় দেবীর শাস্ত্রীয় বিসর্জন। এদিন সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে ভক্তদের ঢল নামে।
বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কের গুলশান-বনানী পূজা মণ্ডপেও দেবীকে সিঁদুর পরাতে জড়ো হন শত শত নারী। সেই বরণের থালায় ছিল সিঁদুর, পান, ফুল ও মিষ্টি; কারো কারো হাতে ছিল শঙ্খ, প্রদীপ ও কলস। একে একে মঞ্চে উঠে নারীরা দেবীর মুখে মিষ্টি ছুঁইয়ে, সিঁদুর পরান। সেই সঙ্গে ঢাকের বাদ্যি আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপ প্রাঙ্গন।
পূজার সব আনুষ্ঠানিকতা ও অঞ্জলি শেষে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শুরু হয় সিঁদুর খেলা। প্রথমে দুর্গাকে এবং পরবর্তীতে একে অপরের কপালে ও গালে সিঁদুর মাখানোর আনুষ্ঠানিকতায় মেতে ওঠেন ভক্তরা। এ সময় নাচে-গানে ‘আনন্দময়ীর’ বন্দনা করা হয় এবং দেবী দুর্গার নামে জয়ধ্বনিও তোলেন তারা।
শুধু বনানীই নয়, রাজধানীর অন্যান্য মন্দিরগুলোতেও দুর্গোৎসবের শেষ দিনের আমেজ ও বিদায়ের সুর। রমনা কালী মন্দিরে বেলা ১১টায় সেখানে গিয়ে দেখা যায়, হাজারো ভক্তের পদচারণায় মুখরিত মন্দির প্রাঙ্গণ। একদিকে চলছে বিদায়ী আরতি ও দেবীর পায়ে শেষ অঞ্জলি অর্পণ, অন্যদিকে মন্দিরের বিশাল মণ্ডপের মাঠে নাচে-গানে মেতেছেন দর্শনার্থীরা। ঢাকের তাল, শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠে। নারীদের পাশাপাশি এতে অংশ নেয় পুরুষ, তরুণ ও শিশু কিশোররা।

স্বামীরাও তাদের স্ত্রীর কপালে সিঁদুর দিয়ে নিজেদের সংসারের মঙ্গল কামনা করেন। মন্দিরে স্বামীর সঙ্গে আসা ভক্ত অনিন্দিতা দেবনাথ বলেন, ‘মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছি তিনি যেন সারাবছর সবাইকে সুস্থ ও ভালো রাখেন। সবাই মিলে সিঁদুর খেলার আনন্দটাই আলাদা, তাই প্রতি বছর এখানে ছুটে আসি। বিদায়ের বিষাদ ছড়িয়ে পড়লেও একদল তরুণের কণ্ঠে ভেসে আসে, ‘আসছে বছর আবার হবে, বছর বছর আসতে হবে’।
রমনা কালী মন্দিরে বন্ধুদের সঙ্গে নাচে-গানে মেতে থাকা তরুণ অর্ঘ্য রায় বলেন, ‘বিদায়ের সুর বাজলেও মায়ের তো আবার আসার কথা, তাই মন খারাপ না করে আমরা আনন্দে মাতি। 'আসছে বছর আবার হবে'-এই আশাতেই মা দুর্গার বিদায়টাকেও স্মরণীয় করে রাখার চেষ্টা করছি।’
অন্যদিকে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরেও সকাল থেকেই ছিল ভক্তি ও বিষাদের মিশ্র আবহ। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে দশমী বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী দুর্গার পূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।এরপর বেলা ১১টা থেকে ভক্তদের দেবী বরণ শুরু হয়। দেবী বরণ শেষে দুপুর ১২টায় সিঁদুর খেলা শুরু হয়। লাল-সাদা শাড়িতে সজ্জিত নারীরা ঢাকের তালে মেতে ওঠেন সিঁদুর খেলায়; পরস্পরের গালে ও কপালে সিঁদুর মাখিয়ে স্বামীদের দীর্ঘায়ু ও পরিবারের কল্যাণ প্রার্থনা করেন। মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীকে বিদায় জানাতে এসে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ভক্তরা।
বনানী মণ্ডপে আসা ভক্ত রিম্পা সেন বলেন, ‘সারাটা বছর ধরে এই কয়টা দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকি। দেখতে দেখতে দিনগুলো যেন চোখের পলকে কেটে গেল! মা চলে যাচ্ছেন ভেবে মনটা ভারী হয়ে আসছে, তবে বিশ্বাস আছে, মা আমাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করবেন এবং আগামী বছর আবার শান্তির বার্তা নিয়ে ফিরে আসবেন।’
মহালয়ার দিন ‘কন্যারূপে’ ধরায় আসেন দশভূজা দেবী দুর্গা; বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তাকে এক বছরের জন্য বিদায় জানানো হয়। তার এই ‘আগমন ও প্রস্থানের’ মাঝে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত চলে দুর্গোৎসব। সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ‘পিতৃগৃহ’ থেকে পুত্র-কন্যা নিয়ে দুর্গা ফিরে যাবেন কৈলাসে তার ‘স্বামীর’ ঘরে। এক বছর পর নতুন শরতে আবার তিনি আসবেন এই ধরণীতে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









