রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক সড়কে পুনরায় অবরোধের মুখে পড়ার আশঙ্কায় প্রায় তিন হাজার পর্যটককে বিশেষ নিরাপত্তায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আটকে পড়ার হাত থেকে বাঁচাতে সেনা ও পুলিশের কড়া পাহারায় ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটককে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে পাঠায় স্থানীয় প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা প্রহরায় পর্যটকদের বহনকারী যানবাহনগুলো সাজেক থেকে বাঘাইহাটের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখান থেকে তাদের খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
এর আগে সকাল ৬টার দিকে সাজেক সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং শুরু করেন অবরোধকারীরা। এতে সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পরিস্থিতি বিবেচনায় বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেকে পর্যটক ভ্রমণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী।
১১ অক্টোবর থেকে দফায় দফায় অচল সাজেক সড়ক: সাজেক সড়কে অবরোধ ও পর্যটক চলাচলে বিঘ্ন ঘটার ঘটনা নতুন নয়। গত ১১ অক্টোবর তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ঘোষণা দেয়। এ সময় গঙ্গারাম উঁচাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় পিকেটিংয়ের কারণে সাজেক ও খাগড়াছড়ির মধ্যকার সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে আকস্মিকভাবে আটকা পড়েন সহস্রাধিক পর্যটক।
পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সেনাবাহিনী ও পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আটকে পড়া প্রায় ১ হাজার ২০০ পর্যটককে নিরাপদে সাজেক থেকে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে, সাজেকে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা পর্যটকদের যাতায়াতও স্থগিত রাখতে হয়।
টানা এই অবরোধ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সাধারণ পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় জেলা প্রশাসন। পাশাপাশি, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে ওই এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
দুর্গাপূজায় শিথিল, ফের অবরোধ: পরবর্তী সময়ে দুর্গাপূজা উপলক্ষে পর্যটন ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি বিবেচনায় অবরোধ কর্মসূচি সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়। ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত পূজার ছুটিতে পর্যটকদের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করা হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর প্রথম দিনেই পাঁচ শতাধিক পর্যটক সাজেকে প্রবেশ করেন।
তবে পূজার ছুটি শেষে আবারো সড়কে অবরোধ শুরু হওয়ায় সাজেকের পর্যটন পরিস্থিতি নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে পুনরায় ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি এবং নিরাপত্তা প্রহরায় পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হয়েছে।
পর্যটননির্ভর অর্থনীতি ও স্থানীয় জীবিকায় চরম অনিশ্চয়তা: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাজেকের মূল চালিকাশক্তি এর পর্যটন খাত। রিসোর্ট-কটেজ, পরিবহন, রেস্তোরাঁ এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা এই খাতের ওপরই সরাসরি নির্ভরশীল। তবে সাজেক সড়কে বারবার অবরোধ ও পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে পুরো খাতের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগাম বুকিং বাতিল হওয়ায় কটেজ মালিকদের ক্ষতি, পর্যটকবাহী যানবাহনের চালক-শ্রমিকদের আয় বন্ধ হওয়া এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের লোকসানের কারণে সবাই চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মন জানান, ‘সাজেক সড়কে অবরোধের কারণে ছুটি শেষ হওয়ার আগেই পর্যটকরা সাজেক ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এতে পর্যটক ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। অবরোধ এবং প্রশাসনের এই নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে দ্রুতই সাজেক আবারও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে বলে আমরা আশা করছি।’
ভাবমূর্তি ও পর্যটনে প্রভাব: বারবার সড়ক অবরোধের ফলে পর্যটকদের নির্ধারিত ভ্রমণ পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে। এতে সাজেকের পর্যটন খাতের সামগ্রিক ভাবমূর্তি ও আকর্ষণ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
দ্রুত সমাধানের দাবি: সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের দাবি, কেবল সাময়িক নিরাপত্তা দেওয়া নয়, বরং পর্যটকদের স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবরোধের মূল কারণ ও আন্দোলনকারীদের দাবির একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি। অন্যথায় সাজেকের পর্যটনশিল্প এবং এর ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









