রাজধানীতে চাঁদাবাজির বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটনার পর সক্রিয় ৫৪৫ সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করেছে সরকার। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এই তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র। এই তালিকা অনুযায়ী চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশ এখনও পুরোদমে অভিযান শুরু করতে পারে নি। কারণ তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার-পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে কর্মকর্তাদের কাছে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। সংবাদ মাধ্যমের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কি না বা নিলে কোনো বিপদে পড়তে হবে কি না, এ নিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা দ্বিধায় ভুগছেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২য় বারের মতো এ ধরনের তালিকা তৈরি করা হয়। এর আগে ডিএমপি ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের তালিকা তৈরি করেছিল, সেই তালিকায় দেখা যায়, একটি বড় অংশই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই তালিকার মধ্যে ২১৫ জনের নাম-পরিচয় মিলেছে। এর মধ্যে অন্তত ৭৫ জনের সঙ্গে বিএনপি বা এর সহযোগী সংগঠনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তালিকাভুক্ত বাকি ১৩৪ জনের কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয় পাওয়া যায় নি। অবশিষ্ট ৬ জনের মধ্যে ২ জন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং দুজন সাবেক পুলিশ সদস্য।
ডিএমপির অপরাধ বিষয়ক যুগ্ম কমিশনার মো. ফারুক হোসেন জানান, আগের তালিকা যাচাই-বাছাই এবং মাঠপর্যায় থেকে নতুন তথ্য সংগ্রহের পর সর্বশেষ তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত কয়েকজনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। সম্প্রতি রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও জমি দখলের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা যখন বাড়ছে, ঠিক তখন এই তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি সন্দেহভাজন চাঁদাবাজ রয়েছে তেজগাঁও বিভাগে ১৫৫ জন। এর পরের অবস্থানে রয়েছে গুলশানে ৮৫ জন, উত্তরায় ৭২, লালবাগে ৭১, মিরপুরে ৬৬, রমনায় ৫০, ওয়ারীতে ২৪ ও মতিঝিলে ২২ জন। ডিএমপির গণমাধ্যম শাখার তথ্য অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মিজানুর রহমান স্বপনও রয়েছেন।
গত ৫ অক্টোবর স্পেশাল রেস্পন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) স্বপনকে আটক করে শেরেবাংলানগর থানায় হস্তান্তর করে। পরদিন পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করলে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন। এক চিকিৎসকের কাছে চাঁদাবাজির অভিযোগে করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। এসআরবি সূত্র জানিয়েছে, ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগেই স্বপনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
শেরেবাংলানগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, এসআরবি কোনো নির্দিষ্ট মামলার আসামি হিসেবে স্বপনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করেনি। ফলে একটি পুরোনো চাঁদাবাজির মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
তেজগাঁও বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি এসআরবি খিলক্ষেত এলাকার এক বিএনপি নেতাকে তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে, যার নাম ওই তালিকায় ছিল। ঔ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের বেশ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল, কারণ তাকে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে আমরা সিদ্ধান্তহীনতায় ছিলাম। পরে কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির এক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কিন্তু দুই দিনের মধ্যেই তিনি জামিন পেয়ে যান।’ তিনি আরও বলেন, ‘তালিকাভুক্ত কোনো চাঁদাবাজ যদি ২-৩ দিনের মধ্যেই জামিন পেয়ে যান, তবে এভাবে তালিকা করে বা গ্রেপ্তার করে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা ছাড়া পুলিশ চাইলেই কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে না। আমরা যদি কেবল তালিকার ওপর ভিত্তি করে কাউকে গ্রেপ্তার করি, তবে তাকে কোন মামলায় গ্রেপ্তার দেখাব? এ ব্যাপারে আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। যেহেতু এখন পর্যন্ত আমরা কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাইনি, তাই আমরা ধীরে এগোচ্ছি।’
পুলিশের বেশ কয়েক জন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধু পুলিশের পক্ষে এই অভিযান কার্যকরভাবে চালানো সম্ভব নয়। কারণ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা যেকোনো সময় বিপদে বা রোষানলে পড়ার ভয় পাচ্ছেন।
তালিকাভুক্ত অনেক চাঁদাবাজেরই বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে উল্লেখ করে ডিএমপির এক অতিরিক্ত সহকারী কমিশনার বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের যখনই চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তারা তা করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। তাদের যুক্তি হলো, এই ব্যক্তিরা বিভিন্ন সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠ, তাই পরে তারা এর প্রতিশোধ নিতে পারে। যদি এসআরবি বা সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়, তবে তা বেশি কার্যকর হবে বলে মন দেন তিনি।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের প্রত্যাশা পূরণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বদ্ধপরিকর। যারা এই প্রতিশ্রুতি নষ্ট করতে চায়, সে আমাদের দলের হোক বা বাইরের—প্রশাসনের উচিত তাদের কাউকে ছাড় না দেওয়া। অপরাধে জড়িত ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে দল বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নেতা তারেক রহমান যেখানে অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই একজন ক্ষমতাসীন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন, এমনকি ছাত্রদল ও যুবদলসহ দলের মহানগর ইউনিটের কমিটি বিলুপ্ত করেছেন, সেই উদাহরণের পর কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য আর কোনো বার্তা বাকি থাকে?’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ জানান, যৌথ অভিযান ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধীদের কোনো ঢাল হতে পারে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। আইন অনুযায়ীই পুলিশ ব্যবস্থা নেবে বলে জানান তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









