একসময় বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এবং মুঘল রাজপরিবারের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল ঢাকাই মসলিন। শত শত বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সেই ঐতিহাসিক গৌরব আজ বাংলাদেশ সরকারের সদিচ্ছা এবং গবেষক ও তাঁতিদের নিরলস পরিশ্রমে আবার ফিরে আসছে আমাদের জীবনে।
ঢাকাই মসলিনের সূক্ষ্মতা ও গুণগত মানের কথা ইতিহাসে কিংবদন্তিতুল্য।
কথিত আছে, একটি আস্ত আড়াই শ গজ লম্বা মসলিন কাপড় একটি ছোট আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে গলিয়ে ফেলা যেত। ১৮৫০ সালে লন্ডনে ঢাকাই মসলিনের শেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর ঔপনিবেশিক নীতি, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং অন্যান্য কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় এই অমূল্য শিল্প ও এর তৈরির কারিগরি কৌশল।
প্রায় ১৭০ থেকে ২০০ বছর পর হারিয়ে যাওয়া ঢাকাই মসলিনকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে ২০১৪ সালে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের অধীনে ২০১৮ সালের শেষের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশের সোনালি ঐতিহ্য মসলিন সুতা তৈরির প্রযুক্তি ও মসলিন কাপড় পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখে। এই পুনরুজ্জীবনের পেছনে রয়েছে কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন: মূল উপাদান 'ফুটি কার্পাস' এর সন্ধান: দীর্ঘ গবেষণা ও উদ্ভিদ অনুসন্ধানের পর মসলিন সুতা তৈরির আদি ও মূল তুলা 'ফুটি কার্পাস'-এর বীজ বা উদ্ভিদের সন্ধান মেলে। সুতার মান উন্নয়ন: গবেষক ও দক্ষ তাঁতিদের যৌথ প্রচেষ্টায় ৮০ মেট্রিক কাউন্ট থেকে বাড়িয়ে সুতার মান ৭৫০ মেট্রিক কাউন্ট পর্যন্ত সূক্ষ্ম মসলিন সুতা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
প্রকল্পের পর্যায় ও জিআই স্বীকৃতি: প্রথম ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর বর্তমানে ১৮.৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় চলমান রয়েছে এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের প্রস্তুতি চলছিল। পাশাপাশি, ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর ঢাকাই মসলিন আনুষ্ঠানিকভাবে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এবার বাণিজ্যিক উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফুটি কার্পাস তুলা শনাক্তকরণ, হাতে সুতা কাটা ও ঐতিহ্যবাহী তাঁতে কাপড় বোনার প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের পর তা বাণিজ্যিকভাবে বেসরকারি খাতে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। মসলিন দেখে দেশি-বিদেশি ক্রেতা ও উদ্যোক্তারা আগ্রহ দেখিয়েছেন। চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকাই মসলিন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের পরিচালক মো. আইয়ুব আলী গণমাধ্যমকে বলেন, পাঠ্যবইয়ে পড়া বাঙালির ঐতিহ্য এখন নিজেরা তৈরি করতে পারছি। শুধু মসলিন তৈরি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত প্রযুক্তিও আমাদের হাতে এসেছে।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের উদ্যোক্তা ও ক্রেতারা মসলিনে আগ্রহ দেখিয়েছেন। ফ্রান্সে মুঘল ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেন, এমন কয়েকজনও এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০০ গজ মসলিন নেওয়ার অনুরোধ এসেছে।
তিনি বলেন, দেশে বাণিজ্যিক উৎপাদনের অনুমতি চেয়ে ১৫ জন উদ্যোক্তা আবেদন করেছেন। উপযুক্ত উদ্যোক্তাদের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রযুক্তি হস্তান্তরের নিয়ম ও পদ্ধতিও নথিভুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতে মসলিন দেখে দেশীয় শৌখিন ও সচ্ছল ক্রেতারাও আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে এখনই প্রকল্পের তৈরি কাপড় বিক্রির পরিকল্পনা নেই। বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থা গড়ে উঠলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ঢাকাই মসলিন কাপড় বাজারে ছাড়া হবে। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ২৭টি শাড়ি, ২০টি স্কার্ফ ও রুমালের মতো ১১টি নমুনা কাপড় তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে তৈরি হয় আরও ৩১টি শাড়ি ও ১৪টি স্কার্ফ। এসব নমুনা বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









