১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩৯ টাকা বাড়িয়ে ১৯৭৬ টাকা করার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি কমিটি। এ ছাড়া পরিচালন ব্যয়, অর্থায়ন ব্যয় ও আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে অস্থিরতা ও ব্যবসায়ীদের নানামুখী চাপের মুখে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন যে গণশুনানির আয়োজন করেছে, সেখানে এ খাতের ব্যবসায়ীরা কমিশন বাড়ানোর দাবি তুলে ধরেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় বিআইএএম ফাউন্ডেশনে এলপিজির দাম সমন্বয় নিয়ে আয়োজিত গণশুনানিতে কমিটির চেয়ারম্যান মো. দিদারুল আলম এ প্রস্তাব দেন।
গণশুনানিতে অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটারে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯৩ টাকা ৮৮ পয়সা করারও সুপারিশ করেছে বিইআরসি কারিগরি কমিটি। খুচরা দাম বাড়ানোর পাশাপাশি এলপিজি সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণের চার্জ এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি। বেসরকারি এলপিজি অপারেটরদের সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণের চার্জ প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পরিবেশকদের কমিশন প্রতি কেজিতে ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৬ টাকা ৬৭ পয়সা হবে। এতে ১২ কেজির প্রতিটি সিলিন্ডার বিক্রিতে তাদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা হবে। একইভাবে, খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন প্রতি কেজিতে ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে ১২ কেজির প্রতিটি সিলিন্ডার বিক্রিতে তাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা হবে।
শুনানিতে দিদারুল আলম বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রচলিত সরবরাহকারীদের বদলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি বাড়ায় জাহাজ চলাচলের পথ দীর্ঘ হয়েছে এবং পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে, অপারেটররা তাৎক্ষণিক বাজার থেকে পণ্য কেনার ওপর বেশি নির্ভর করায় এ ব্যয় আরও বেড়েছে।’
বিইআরসির কারিগরি কমিটির উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের আমদানি করা এলপিজির প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বিইআরসির হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৮ লাখ টন এলপিজি ব্যবহৃত হয়। দেশের মোট এলপিজি সরবরাহের প্রায় ৯৯ শতাংশই আসে বেসরকারি অপারেটরদের কাছ থেকে। আমদানি ব্যয়, সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণের চার্জ এবং বিতরণ ব্যয়সহ এলপিজি সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন খরচ পর্যালোচনা করে এ মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন। এলপিজির দাম নির্ধারণের নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গণশুনানিতে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। বিইআরসি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা না করা পর্যন্ত প্রস্তাবিত দাম কার্যকর হবে না।
‘বিরাট’ ফর্দ হাতে গণশুনানিতে ব্যবসায়ীরা
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস-এলপিজির বাজারে অস্থিরতা ও ব্যবসায়ীদের নানামুখী চাপের মুখে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন যে গণশুনানির আয়োজন করেছে, সেখানে এ খাতের ব্যবসায়ীরা কমিশন বাড়ানোর দাবি তুলে ধরেছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান যুদ্ধ, সাগরে জাহাজ ভাড়া থেকে রাস্তায় ট্রাকের খরচ বেড়ে গেছে, এমন নানা যুক্তিতে এলপিজির আমদানিকারক, ডিলার ও পরিবেশকরা তাদের বাড়তি কমিশনের ফর্দ দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার বিয়াম মিলনায়তনে আয়োজিত গণশুনানিতে তাদের এসব প্রস্তাবের বিপরীতে জেরাকারীরা বলেন, ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবনা দেখে মনে হচ্ছে রাশিয়ায়-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা ইরান যুদ্ধের পুরো খরচ বহন করছে বাংলাদেশ।
যুদ্ধের কারণে যদি এখন গ্যাসের দাম বাড়াতে হয় তাহলে গত ডিসেম্বরে কেন আড়াই হাজার টাকা করে ১২ কেজির একেকটা সিলিন্ডার কিনতে হল, এমন প্রশ্নও রেখেছেন তারা। অপারেটরদের ‘সৃষ্ট’ কৃত্রিম সংকটের মুখে বিইআরসি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, এমন অভিযোগ এসেছে জেরাকারীদের মুখ থেকে। এ ছাড়া কমিশন বাড়ালে অবধারিতভাবেই এলপিজির দাম আরেক দফায় বাড়বে, এই গণশুনানি সেই দাম বাড়ানোর কেবল আনুষ্ঠানিকতা কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অক্টোবরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১৮৩৭ টাকা করা হয়। তবে দেশের প্রায় কোথাও এ দামে এলপিজি কিনতে পারছেন না ভোক্তারা, সিলিন্ডারপ্রতি ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।
দাম বাড়ানোর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বাজারে এলপিজি সরবরাহ সংকট দেয়। ৪ অক্টোবর দাম বাড়ানো হলেও এলপিজির বাজারে অস্থিরতা চলছে। বর্তমান সরকারি দামে তাদের না পোষানোর কথা তুলে ধরে নতুন মূল্য নির্ধারণে কমিশন বাড়ানোসহ গ্যাস বাজারজাত করার বিভিন্ন ধাপে বাড়তি ব্যয়ের সমন্বয় চায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বোতলজাতকারী কোম্পানিগুলো। কোম্পানিগুলো কেজিপ্রতি গ্যাস মজুত ও বোতলজাত করার খরচের সঙ্গে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর আবেদন করেছে। পাশাপাশি বিনিয়োগের ওপর মুনাফা বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছে। পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের সংগঠন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড গত ১৫ এবং ১৬ অক্টোবর ধর্মঘটের ডাক দেয়।
সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ১৪ অক্টোবর সেই কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়। আর সেদিনই এই গণশুনানির ঘোষণা আসে। ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে বিইআরসি এই গণশুনানির আয়োজন করেছে কিনা, এমন প্রশ্ন উঠেছে শুনানিতে। গণশুনানিতে এলপিজি আমদানিকারক, পরিবেশক ও অটোগ্যাস স্টেশন মালিক সমিতির প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। তারা সবাই নিজ নিজ কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব রেখেছেন। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডারের কমিশন আমদানিকারকেরা ৩০০ টাকার বেশি ও পরিবেশকেরা ১৫০ করার দাবি তুলেছেন। আর গাড়িতে ব্যবহৃত অটোগ্যাস স্টেশন মালিকরা তাদের কমিশন ৮ টাকা থেকে ১১ টাকা করার প্রস্তাব করেন। শুনানিতে ১২ কেজির সিলিন্ডারে বর্তমান কমিশন ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা করার প্রস্তাব করে। তবে সবচেয়ে কম ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে মেঘনা গ্রুপ।
অন্যদিকে পরিবেশকরা তাদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা, খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। গণ শুনানিতে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগে জাহাজভাড়াসহ প্রিমিয়াম ছিল প্রতি টনে ৮০ থেকে ১২০ ডলার। এটি এখন ২৫০ থেকে ৪০০ ডলারে ঠেকেছে। পরিচালন খরচ বেড়েছে। সব বিবেচনায় নিয়ে এমন দাম নির্ধারণ করা উচিত, যাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকা বেশি বাজারে কেউ নিতে না পারে।
আমদানিতে না থাকা ওরিয়ন গ্যাসের চিফ অপারেটিং অফিসার অনুপ কুমার সেন বলেন, নতুন বাস্তবতায় ১০টা কোম্পানি আমদানি করতে পারছে না। তাদের অবকাঠামো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়েছে। এতে বাজারে সিলিন্ডার সংকট তৈরি হয়েছে। অন্য কোম্পানির কাছ থেকে কিনে নিয়ে বিইআরসির দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। তাই পাইকারি দাম নির্ধারণের দাবি তাদের। বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, এর ফলে কৃত্রিম সংকট কমবে ও বাজারে অন্যায্য দাম নেওয়া বন্ধ হবে।
পরিবেশক মেসার্স উজ্জল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মনি মুক্তা পাল বলেন, অলস সিলিন্ডারের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। সিলিন্ডারে ১৫০ টাকা কমিশনের দাবি পূরণ না হলে বাজারে চলমান পরিস্থিতি বিরাজমান থাকবে ও দাম কমবে না। আরেক পরিবেশক তাহের এন্টারপ্রাইজের আবু তাহের কোরাইশি বলেন, যত্রতত্র দোকান দিয়ে ব্যবসা করা বন্ধ করতে হবে।
অটোগ্যাস সমিতির সভাপতি সিরাজুল মাওলা বলেন, ২ লাখের বেশি গাড়ি এলপিজি দিয়ে চলে। ২০২১ সালে ৮ টাকা কমিশন নির্ধারণ করেছিল। এরপর পাঁচ বছর চলে গেছে।
পরিচালন খরচ বেড়েছে। তার দাবি, দেশের ১১০০ অটোগ্যাস পাম্পের মধ্যে ৮০ শতাংশই লোকসানে চলছে। কমিশন ১০ টাকা হলে ক্ষতি দূর হবে, কিছুটা মুনাফা দিয়ে ১১ টাকা করার দাবি তাদের। এটা ছাড়া টেকা সম্ভব নয় বলে দাবি করেন সিরাজুল মাওলা। দেশে সক্রিয় ৩৫টি কোম্পানি মধ্যে এলপিজি আমদানির অবকাঠামোগত সক্ষমতা আছে ২৩টি কোম্পানির। গত মাসে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি কোম্পানি।
জেরাকারীদের একজন সাংবাদিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “ব্যবসায়ীদের কথা শুনে মনে হচ্ছে ওই দিকে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এদিকে ইরান যুদ্ধের পুরো খরচ বাংলাদেশ বহন করছে। কিন্তু গত ডিসেম্বরেও আমাদের সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে আড়াই হাজার টাকা করে। তখন কেন এত বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হল, সেই ব্যাখ্যা কারো কাছে নেই। ‘দাম বাড়বে বলে কোম্পানিগুলো গ্যাস আটকে রেখেছে, কিন্তু বিইআরসি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’ ঢাকাতে এখন ২২০০ টাকার নিচে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীদের এসব দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবকে অযৌক্তিক ও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন সিরাজুল ইসলাম।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









