বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যনীতি ও শুল্ক কাঠামো দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে উচ্চ শুল্কের কারণে দেশের ১৮ কোটি ভোক্তাকে বিশ্ববাজারের চেয়ে দ্বিগুণ দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতার কারণে মুখ থুবড়ে পড়ছে ব্যবসাবান্ধব সংস্কার। এমনকি সরকারের ভেতরে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা উপদলের স্বার্থের দ্বন্দ্বে ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টার’ অভাব প্রকট।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় গতকাল সোমবার দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার।
ড. জায়েদি সাত্তার তার প্রবন্ধে দেখান, বাংলাদেশের গড় শুল্ক হার বর্তমানে প্রায় ২৮ শতাংশ, যা বিশ্ব গড় (৬%) এবং নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর (৭.২%) তুলনায় অনেক বেশি।
তিনি বলেন, “আমরা কিছু নির্দিষ্ট শিল্পকে রক্ষা করতে গিয়ে যে অতি-সুরক্ষা দিচ্ছি, তা আসলে ভোক্তাদের ওপর চাপানো এক ধরনের ‘সুরক্ষা কর’। এর ফলে সাধারণ মানুষ চাল, ডাল, লবণ থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যে বিশ্ববাজারের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ বেশি দাম দিতে বাধ্য হচ্ছে।’
প্রবন্ধে আরো বলা হয়, প্যারা-ট্যারিফের প্রভাবে বর্তমানে রপ্তানির চেয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রি বেশি লাভজনক। ফলে উদ্যোক্তারা রপ্তানিতে উৎসাহিত হচ্ছেন না, যা অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী ‘অ্যান্টি-এক্সপোর্ট বায়াস’ বা রপ্তানি বিরোধী পরিবেশ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সরাসরি কথা বলেছেন সরকারের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে। তিনি সরকারকে একটি ‘বনের’ সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, “মানুষ সরকারকে একক মনে করলেও এর ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট সরকার আছে। এখানে বাঘ-সিংহের মতো প্রত্যেকের নিজস্ব স্বার্থ কাজ করে। প্রাক্টিক্যালি আমি সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রবণতা খুব একটা দেখি না। উচ্চ পর্যায়ে সংস্কারের বিষয়ে ঐক্যমত্য থাকলেও বন্দর বা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের সময়নানা বাধার সৃষ্টি হয়।‘
বিডার ফোকাস শুধু বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ওপর— এমন ধারণা নাকচ করে আশিক চৌধুরী বলেন, “বিডার দায়িত্ব স্থানীয় ও বিদেশি সব বিনিয়োগকারীর হয়ে সরকারের ভেতরে অ্যাডভোকেসি করা। দেশের মোট বিনিয়োগের সিংহভাগই স্থানীয় এবং ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। তবে জ্বালানি সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বিদেশি বা স্থানীয় কোনো বিনিয়োগকারীর পক্ষেই ‘বাংলাদেশ স্টোরি‘তে বিশ্বাস করা কঠিন হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি জবাবদিহিমূলক, আস্থাশীল ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা। নতুন সরকারের ম্যান্ডেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা বড় ফোকাস। আর কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার কোনো বিকল্প নেই।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক কমিশনার মো. ফরিদ উদ্দিন এনবিআরের বর্তমান কাঠামোর সমালোচনা করে বলেন, “যিনি পলিসি বানাবেন তিনিই যদি ইমপ্লিমেন্ট করেন, তবে সেখানে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট (স্বার্থের সংঘাত) তৈরি হবেই। ট্যাক্স পলিসি এনবিআর থেকে আলাদা করা জরুরি।’ তিনি অভিযোগ করেন, বাণিজ্য বা শিল্প মন্ত্রণালয় বাজেটের আগে লিখিতভাবে সাপ্লাই চেইন বা ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় এনবিআরকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয় না, যা চরম সমন্বয়হীনতার প্রমাণ।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, “কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ীকে প্রটেকশন দিতে গিয়ে আমরা ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থ বিসর্জন দিচ্ছি। ৩ লাখ লবণচাষিকে বাঁচানোর কথা বলে যে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে, তাতে আমদানির চেয়ে ৪ গুণ বেশি দামে ভোক্তা লবণ কিনছে। গরুর মাংস আমদানির সুযোগ দিলে মানুষ ৫০০ টাকায় খেতে পারত, যা এখন ৯০০ টাকা।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, বিগত সরকারের পতনের অন্যতম বড় কারণ ছিল দ্রব্যমূল্য। বর্তমান সরকারকে তাই শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় ভোক্তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা একমত হন, ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন এবং শুল্ক কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ অপরিহার্য। শুধু শুল্ক দিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর নীতি থেকে বেরিয়ে এসে আমদানির পরিমাণ বাড়িয়ে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্যাক্স নেট সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্যথায় বিনিয়োগ আকর্ষণে ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়েই থাকবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









