বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

ভাগ্য খুলছে পদ্মা ব্যারাজের

প্রকাশিত: ১২ মে ২০২৬, ০৭:০২ পিএম

আপডেট: ১২ মে ২০২৬, ০৭:০২ পিএম

ভাগ্য খুলছে পদ্মা ব্যারাজের

ফাইল ফটো

জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উঠতে যাচ্ছে ‘পদ্মা ব্যারাজ’প্রকল্প। এর আগে গত জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একবার এটি উপস্থাপনের কথা ছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়নি। 

এবার সব ঠিক থাকলে আগামীকাল বুধবার একনেকে উঠবে বহুল আলোচিত প্রকল্পটি। পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বললেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে দোটানায় ছিল নতুন সরকার। এখন সেটি কেটে গেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার কোটি টাকা। বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও ছিল এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি। তারপরও কেন এটি এতদিন একনেকে ওঠেনি, তা নিয়েও রাজনীতি সচেতন মানুষের মনে এক ধরনের প্রশ্ন ছিল।

পরিকল্পনা কমিশনের ওই কর্মকর্তা আশ্বস্ত করে বলেছেন, এবার একনেকের বৈঠকে প্রকল্পটি উঠবেই, সে বিষয়ে পাকা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর কোনো বাধা নেই। তবে অনুমোদন পাবে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।  বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ২০০২ সালে এ ধরনের একটি প্রকল্প নেওয়ার আলোচনা ছিল। এমন উদ্যোগের প্রাথমিক প্রস্তাবনা ছিল পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে, এমন তথ্য পাওয়া যায়। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। এরপর ২০১৬ সাল পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটির নকশা প্রণয়নে কাজ করে। 

ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশ রক্ষায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। আবার ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিতেও এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কেননা প্রতিবেশী দেশ ভারত প্রকল্পটিকে কীভাবে নেবে, তাও ভাবনার বিষয়। পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। অনুমোদন মিললে চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। 

অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে কেন এত বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, জানতে চাইলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি) বলেন, এই প্রকল্পটির বিষয়ে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার রয়েছে। তাই এটি নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। একনেক সভায় বিস্তারিত আলোচনা হবে। তারপর এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে।

জানা গেছে, আগামীকাল বুধবারের একনেকে পদ্মা ব্যারাজসহ ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। এবারও ঢাকার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে বসবে না একনেক। সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার কক্ষেই প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে হবে এ বৈঠক।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানি সংরক্ষণ করে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি করা হবে। এর মাধ্যমে পদ্মানির্ভর এলাকার নদীর সিস্টেমকে পুনরুজ্জীবিত করাসহ লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কমানো, সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা কমানো এবং সেচ সুবিধা বাড়ানো হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ওপর গত ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। ওই সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব ( ডিপিপি) সংশোধন করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। শুরুতে ৫০ হাজার ৪৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে সম্পূর্ণ প্রকল্পটি এক ধাপে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সংস্থান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি বা সমন্বয়ে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি ও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তে পারে। 

পাশাপাশি প্রকল্পে প্রস্তাবিত বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ-পরবর্তী সংশ্লিষ্ট নদী সিস্টেম জলাধার থেকে পাওয়া প্রবাহের সঙ্গে হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যালভাবে ধীরে ধীরে অভিযোজিত হওয়ার কথা। ফলে খননসহ সংশ্লিষ্ট কাজগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। এসব চিন্তা করে প্রকল্পের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকল্পটি দুটি পর্যায়ে বিভক্ত করে বাস্তবায়নের জন্য পিইসি সভায় সুপারিশ করা হয়। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ব্যারাজের মূল অবকাঠামো নির্মাণসহ হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী সিস্টেম ও গড়াই-মধুমতি নদী সিস্টেম পুনর্খনন এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বাস্তবায়নযোগ্য অতিরিক্ত বা সহায়ক অবকাঠামো এবং অবশিষ্ট নদী সিস্টেমগুলোর (চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী সিস্টেম) পুনরুদ্ধার কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রথম পর্যায়ে মূল ব্যারাজ ও গড়াই অফটেক স্ট্রাকচারে দুটি হাইড্রো-পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের সংস্থান রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিনা জ্বালানিতে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। 

পরিকল্পনা কমিশন ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পের প্রস্তাবের নথি অনুসারে, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। পদ্মা নদীর ওপর নির্ভরশীল দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমিতে পানির সমস্যা সমাধানে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। যার মাধ্যমে সুন্দরবন অঞ্চল থেকে আসা লবণাক্ততার নিরসন হবে। এতে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে। বাড়বে কৃষি ও মাছের উৎপাদনও। 

প্রকল্পের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। যাতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস ও ২টি ফিশ পাস। এ বাঁধের মাধ্যমে ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে। আর সংরক্ষিত পানি বণ্টনের জন্য তিনটি অফটেক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সংরক্ষিত পানি দিয়ে পাঁচটি নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এগুলো হলো হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা হবে। 

প্রকল্পের নথি বলছে, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের চাষযোগ্য প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে প্রয়োজনীয় সেচের পানি সরবরাহ করা যাবে। এতে প্রায় ২৪ লাখ টন ধানের ও ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সত্তর দশকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের কারণে বাংলাদেশের পদ্মার প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এতে পদ্মার সঙ্গে সংযুক্ত ছয়টি নদী শুকিয়ে যায়। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল থমকে গিয়ে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

এদিকে বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশাল জেলায় পদ্মা নদী একমাত্র সুপেয় পানির উৎস। তাই এসব এলাকার উন্নয়ন যথাযথ পানি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। এ জন্য বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিত পানি সরবরাহের জন্য বাঁধটি নির্মাণ করা হবে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে প্রথম পর্যায়ে ব্যয় হবে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত এ কাজ চলবে। 

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতায় প্রকল্পটির চূড়ান্ত প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। এ বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানির অভাবে আমাদের বিস্তীর্ণ এলাকা শুকিয়ে গেছে। তাপমাত্রাও বেড়ে গেছে। নিশ্চিতভাবেই এ বাঁধের মাধ্যমে সেটার প্রভাব কিছুটা কাটিয়ে ওঠা যাবে। এখানে পানি জমিয়ে আমরা সারা বছর সরবরাহ করতে পারব। প্রকল্পটি অবস্থা জানতে চাইলে মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, আমরা আমাদের কাজ শেষ করে প্রকল্পটি একনেকের জন্য পাঠিয়েছি। এখন সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। 

একসময় প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পরিবেশ ও পানিসম্পদবিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, এটা কোনো নতুন প্রকল্প নয়। ১৯৬৪ সালে এটার আলোচনা শুরু হয়। ১৯৯৭ সালে আমরা এর স্থান নির্ধারণ করি। বাঁধটি নির্মাণে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারত সরকার। তবে পরে নানা রাজনৈতিক কারণে তা আটকে যায়।’প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবহিত নন বলে জানালেও এটার উপকারিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই বলে জানান তিনি। কিন্তু অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন এই বিশেষজ্ঞ।

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.