বোয়িং নাকি এয়ারবাস, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল কোন ব্র্যান্ডের এয়ারক্রাফট কিনবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ইউরোপ না আমেরিকা–কার কাছ থেকে উড়োজাহাজ কিনবে বাংলাদেশ, তা নিয়ে অনেক টানাহেঁচড়ার পর অবশেষে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিমান পরিচালনা পর্ষদ। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান সংস্থা বোয়িং থেকে ১৪টি বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
গত মঙ্গলবার বিমান পরিচালনা পর্ষদে ১৪টি বোয়িং কেনার ‘নীতিগত’ সিদ্ধান্ত হয় বলে কোম্পানির জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম বৃহস্পতিবার জানান।
বিমানের জন্য ইউরোপীয় জায়ান্ট এয়ারবাস নাকি মার্কিন বোয়িং এর উড়োজাহাজ কেন হবে, তা নিয়ে গত দুই বছর ধরে রশি টানাটানি চলছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন আর ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির চাপে শেষ পর্যন্ত বিমানের অর্ডার যাচ্ছে বোয়িংয়ের ব্যাগে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরে এসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ফ্রান্সের কোম্পানি এয়ারবাস থেকে ১০টি বড় উড়োজাহাজ ‘কেনার প্রতিশ্রুতি’ দিয়েছে।
এয়ারবাস থেকে আটটি যাত্রীবাহী ও দুটি পণ্যবাহী উড়োজাহাজ কেনার বিষয় ‘পর্যালোচনার’ মধ্যে আমেরিকান কোম্পানি বোয়িংও তৎপর হয়ে ওঠে। তৎকালীন সরকারের সঙ্গে দুপক্ষেরই দেনদরবার চলে। এর মধ্যেই ২০২৪ সালের অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছর চেয়ারে বসেই যে বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করেন, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। ট্রাম্পের ৩৫ শতাংশ শুল্কের খড়গ থেকে বাঁচতে গত জুলাই মাসে অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।
তাতে ফ্রান্সের কোম্পানি এয়ারবাস থেকে বিমানের জন্য ১০টি বড় উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এরপর ইউরোপও নড়েচড়ে বসে। এয়ারবাস বিক্রির জন্য তারাও চাপ দিতে থাকে সরকারের ওপর।
গত জুন মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাজ্য সফরে গেলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এয়ারবাসের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ভাউটার ভ্যান ভার্স। এর পর থেকে কোম্পানির প্রতিনিধিরা সরকারের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ রেখে চলেন।
গত নভেম্বরের শুরুতে ফ্রান্স দূতাবাসে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা একযোগে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, উড়োজাহাজ কেনার আলোচনায় যেন এয়ারবাসকে ‘যৌক্তিকভাবে’ বিবেচনা করা হয়।
তারা ইউরোপে কয়েক বিলিয়ন ইউরোর বাংলাদেশি পণ্যের বাজার, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ, যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘ অংশীদারত্বের কথা মনে করিয়ে দেন বারবার।
সর্বশেষ গত ২৬ নভেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত র্যুডিগার লোটৎস এক সভায় বলেন, এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার ‘প্রতিশ্রুতি’ থেকে বাংলাদেশ সরে এলে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে ‘প্রভাব পড়বে’।
তিনি বলেন, ইউরোপের বাজারে শুল্কছাড়ের আলোচনার আবহও এয়ারবাস নিয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের কারণে বদলে যেতে পারে।
বিমানের সিদ্ধান্ত: এতসব টানাহেঁচড়ার মধ্যে অবশ্য বিমানের চাওয়া বা না চাওয়ার কোন আলোচনা ছিল না।
এয়ারলাইন্স ব্যবসায় উড়োজাহাজের প্রয়োজন হলে সেই চাহিদা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তরফ থেকে আসার নিয়ম রয়েছে। এখানে যার জন্য উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে, সেই বিমানকেই রাখা হয়েছিল অন্ধকারে। তবে শেষ পর্যন্ত বিমানের পরিচালনা পর্ষদ বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত দিল।
বিমান থেকে জানানো হয়েছে, বোয়িং ও এয়ারবাস দুই পক্ষেরই প্রস্তাব বিমানের টেবিলে ছিল। সরকারের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর গত ২৪ নভেম্বর বোয়িং আনুষ্ঠানিকভাবে বিমান বিক্রি, অন্যান্য শর্তাবলী ও সেগুলো ডেলিভারির বিষয়ে বিস্তারিত প্রস্তাব পাঠায়।
ওই প্রস্তাব অনুযায়ী বোয়িং থেকে ১৪টি এয়ারক্রাফট কেনার সিদ্ধান্ত দেয় বিমানের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে রয়েছে ৮টি সুপরিসর বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার ও ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি ন্যারো বডির বোয়িং ৭৩৭-৮ মডেলের উড়োজাহাজ।
এখন বিমানের পক্ষ থেকে দরকষাকষির জন্য একটি কমিটি করা হবে। এই কমিটি প্রতিটি এয়ারক্রাফটের দাম ও অন্যান্য টেকনিক্যাল বিষয়ে বোয়িং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবে।

সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন







