সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

রোজার পণ্য আটকা বন্দরে, বাজারে সংকটের আশঙ্কা

প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৭ পিএম

আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৭ পিএম

রোজার পণ্য আটকা বন্দরে, বাজারে সংকটের আশঙ্কা

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটারেজ জাহাজ সংকট, টানা শ্রমিক কর্মবিরতি ও নির্বাচনের বন্ধের কারণে ধীরগতিতে পণ্য খালাসের ফলে সৃষ্ট জটে শতাধিক পণ্যবাহী বিদেশি মাদার ভেসেল (জাহাজ) সাগরে ভাসছে বন্দরের সীমানায়। এসব মাদার ভেসেলের মধ্যে অর্ধশতাধিক জাহাজে রয়েছে রমজানের হাজার হাজার টন বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য। এ জাহাজ জটের কারণে রমজানের বাজারে ভোগ্যপণ্যের সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। 

জানা গেছে, বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে বর্তমানে ১১০টি মাদার ভেসেল বন্দরে সীমানায় সাগরে ভাসছে। আগামী দুদিনে আরো অন্তত ১০ জাহাজ বহিঃনোঙ্গরে ভিড়বে। এর মধ্যে ৫৫টির অধিক জাহাজে রয়েছে চাল, ডাল, ছোলা, খেজুর, চিনি, ফলমূল, তেলসহ নানা ভোগ্যপণ্য। চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার চাক্তাই খাতুনগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর এসব পণ্য বন্দরে আনা হলেও সেগুলো যথাসময় খালাস করতে পারেননি আমদানিকারকরা। 

বিশ্বের নানা দেশ থেকে পণ্য নিয়ে আসা একেকটি মাদার ভেসেলের চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে সময় লাগত ৭-১০ দিন। কিন্তু, গত কিছুদিন ধরে লাইটার জাহাজ সংকট, ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তিকে কেন্দ্র করে  বন্দরে টানা শ্রমিক কর্মবিরতি, ও নির্বাচনের ছুটি মিলিয়ে বন্দরে জাহাজ জট সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে দেড় মাসেও পণ্য খালাস হয়নি এমন মাদার ভেসেলও রয়েছে অসংখ্য। 

অপরদিকে বন্দরে স্বাভাবিক অবস্থায় বহির্নোঙরে পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা গড়ে ৪০টির মতো থাকত। মাসাধিককাল ধরে ১০০টি ছাড়িয়ে গেছে। এতে  জাহাজের ভাড়া এবং ডেমারেজ বাবদ কোটি কোটি ডলার গচ্ছা দেয়া ছাড়াও বন্দরের ইমেজ সংকট তৈরি হচ্ছে। 

শবে বরাতের পর থেকে পরের ১৫ দিন রমজানের পণ্য বেচাকেনা হয় চাক্তাই খাতুনগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে। লাইটার জাহাজ সংকট, টানা কর্মবিরতি ও নির্বাচনের ছুটির ফাঁদে পড়ে এবার সে সময় পণ্য বাজারজাত করতে পারেননি আমদানিকারকরা। দেশের বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের এ পণ্য সংকটের প্রভাব দেখা দিয়েছে।  

আরো জানা গেছে, খাতুনগঞ্জে এক সপ্তাহে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। দেশি পেঁয়াজ এক সপ্তাহের ব্যবধানে এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৬-৪২ টাকা কেজিতে, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৩৪-৩৮ টাকা। ভারতীয় পেঁয়াজের দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২-৬৫ টাকা। ১৫ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে রসুন। ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া আদা বিক্রি হচ্ছে এখন ১১৭-১২৫ টাকায়। ছোলার দাম পাঁচ থেকে ১০ টাকা বেড়ে মানভেদে ৭২ থেকে ৭৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অ্যাঙ্কর ডালের দাম ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। সেমাইর দামও প্রতি মণে আগের চেয়ে ১১০-১৫০ টাকা বেড়ে বর্তমানে এক হাজার থেকে ৯৫০ থেকে দুই হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। 

খাতুনগঞ্জের হামিদ উল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিছ বলেন, রমজান ঘিরে বিপুল পরিমাণ আমদানি হলেও সব পণ্য সময়মতো বাজারে আসেনি। কিছু পণ্য বন্দরে ধর্মঘটের কারণে আটকে গেছে। আর কিছু পণ্য জাহাজকে গুদাম বানিয়ে রেখেছেন আমদানিকারকরা। এজন্য সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আবার নির্বাচনী ছুটি শুরু হয়েছে। বন্দরে এখন পণ্য নিয়ে যেসব জাহাজ ভাসছে, সেগুলো রমজানের আগে আর পাইকারি বাজার ধরতে পারবে না বলে তিনি জানান।

সূত্রে প্রকাশ , বন্দরে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে ধীরগতি ও অভ্যন্তরীণ নৌ রুটে পণ্য পরিবহন মুখ থুবড়ে পড়ায় বহির্নোঙরের কার্যক্রম বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। প্রতিদিন অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে অবস্থানকালও। ধীরগতিতে খালাসের কারণে ভোগ্যপণ্য বোঝাই জাহাজগুলো আটকা পড়ায় রমজানে দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছে ব্যবসায়ী মহল। 

অভিযোগ রয়েছে, লাইটারেজ জাহাজ সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা, নিজেদের মধ্যকার বিরোধ এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরটিতে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। আমদানিকারকরা মুক্তবাজার অর্থনীতির মতো অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতকে উন্মুক্ত করে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া সিন্ডিকেট করে চট্টগ্রাম থেকে চলে যাওয়া জাহাজগুলো চট্টগ্রামে ফিরিয়ে আনতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা। 

দেশের আমদানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ হ্যান্ডলিং করা হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। ৯০ শতাংশ পণ্যের ৫২ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয় বন্দরের অভ্যন্তরে, বাকি ৪৮ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয় বহির্নোঙরে। বহির্নোঙরে হ্যান্ডলিংকৃত পণ্যের পুরোটা পরিবাহিত হয় লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে। বন্দরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের ইকুইপমেন্ট থাকলেও বহির্নোঙরে তেমন ইকুইপমেন্ট নেই। জাহাজের ক্রেনের পাশাপাশি গিয়ার, গ্রাব, পে–লোডারের মতো যন্ত্রপাতি দিয়ে বছরে কয়েক কোটি টন পণ্য হ্যান্ডলিং হয়।

জানা গেছে, বিশ্বের নানা দেশ থেকে লাখ লাখ টন পণ্য নিয়ে আসা বড় বড় মাদার ভেসেলগুলো বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না। এসব বড় জাহাজ থেকে পণ্য বহির্নোঙরে লাইটারেজ জাহাজে বোঝাই করা হয়। মাদার ভেসেলের ক্রেনের সাথে গ্রাভ ব্যবহার করে লাখ লাখ টন পণ্য নামানো হয় লাইটারেজ জাহাজে। একেকটি মাদার ভেসেলে একসাথে তিন-চারটি লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করার সুবিধা থাকে। মাদার ভেসেল থেকে নামানো পণ্য কর্ণফুলী নদীর ষোলোটি ঘাটের পাশাপাশি দেশের অন্তত ২৫টি স্থানের ৪১টি ঘাটে প্রেরণ করা হয়। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সেক্টরের নির্দিষ্ট রুট অনুসরণ করে লাইটারেজ জাহাজগুলো পণ্য পরিবহন করে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে প্রায় দেড় হাজার লাইটারেজ জাহাজ রয়েছে।

লাইটার জাহাজ সংকট ২ মাস ধরে ও শ্রমিক কর্মবিরতির কারণে সৃষ্ট বন্দরে পণ্যবাহী মাদার ভেসেল জট কমানো এবং রমজানের পণ্য জাহাজ থেকে নামাতে বন্দর কর্তৃপক্ষ অগ্রাধিকার দিলেও নির্বাচনের ছুটিতে কাঙ্ক্ষিত পণ্য খালাস করা যায়নি। স্বাভাবিকভাবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার পণ্যভর্তি কনটেইনার খালাস হয়। নির্বাচনের সময় যানবাহন চলাচলে ছিল বিধিনিষেধ। 

তাছাড়া নির্বাচন উপলক্ষে ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে টাান ৪৮ ঘণ্টা বন্দরে কার্যক্রম বন্ধ ছিল। খাদ্যদ্রব্যসহ রমজানের পণ্য বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে খালাসের সুযোগ ছিল। এমন শর্ত আরোপের কারণে জাতীয় নির্বাচন ও এর আগে-পরের তিনদিনে স্বাভাবিকের চেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ কম ছিল পণ্য সরবরাহের হার। রমজানের আগে আমদানি করা পণ্য বাজারে তুলতে এখন তাই দৌড়ঝাঁপ করছেন ব্যবসায়ীরা।

একাধিক ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক জানান,  নির্বাচন ও রমজান কাছাকাছি সময়ে হওয়ায় এবার আগেভাগে পণ্য এনেছিলেন অনেক আমদানিকারক। কিন্তু বন্দরের বিভিন্ন সংকটের কারণে অনেকেই প্রত্যাশিত সময়ে সেই পণ্য বাজারে আনতে পারেননি। এজন্য বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন বেশকিছু ব্যবসায়ী। 

আমদানিকারকরা আরো জানান, ভোটের আগে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করার ইস্যু নিয়ে টানা শ্রমিক কর্মবিরতির কারণে বন্দরে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা গত ৯ ফেব্রুয়ারি কেটে গেলেও প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। বন্দরে আসা ১১০টি জাহাজে আটকা পড়েছে প্রায় ৫০ লাখ টন পণ্য। এর মধ্যে কনটেইনার জাহাজই আছে ২৩টি। এসব কনটেইনার জাহাজে আছে খেজুর, ফলমূলসহ শিল্পের কাঁচামাল। খাদ্যসামগ্রীর জাহাজ আছে ২০টি। চিনি বোঝাই জাহাজ আছে পাঁচটি। অন্যান্য জাহাজে আছে তেল, গম, ডাল, মসুর ডালসহ ১০ ধরনের পণ্য। রমজান ও নির্বাচন কাছাকাছি সময়ে থাকায় এসব পণ্য ফেব্রুয়ারির শুরুতেই খালাস করতে চেয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। তবে মাসের প্রথম ৯ দিনের মধ্যে সাত দিনই কর্মবিরতি ছিল বন্দরে। মাঝে দুদিন কর্মবিরতি না থাকলেও সেই দুদিন ছিল শুক্র ও শনিবার। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ফের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করতে থাকেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। সেটি তারা স্থগিত করেন ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। 

অপরদিকে, বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, জানুয়ারি থেকে লাইটার জাহাজের সংকটের মধ্যেই ফেব্রুয়ারিতে বন্দরে শুরু হয় শ্রমিক কর্মবিরতি। এক পর্যায়ে নির্বাচনের ৩দিন পূর্বে শ্রমিক কর্মবিরতি প্রত্যাহার হলেও পণ্য ও জাহাজের যে জট লেগেছে তা এখনো স্বাভাবিক হয়নি। বন্দর থেকে ২০ ফুট এককের (টিইইউ) প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার পণ্যবাহী কনটেইনার খালাস হয়। তবে কর্মবিরতির প্রথম ছয় দিনে খালাস হয়েছে আট হাজার ৮৬১ কনটেইনার। এ হিসাবে গড়ে গেছে মাত্র এক হাজার ৪৭৬ কনটেইনার। ফেব্রুয়ারির প্রথম ৯ দিনের মধ্যে তিনদিন ছিল অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি। সেই তিনদিনে একটি পণ্যবাহী কনটেইনারও খালাস হয়নি। 

কর্মবিরতি প্রত্যাহারের পর পরিস্থিতি দুদিন স্বাভাবিক থাকলেও নির্বাচনি ছুটি শুরু হতে আবার কমে যায় পণ্য খালাসের হার। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচরে দিন ও এর আগে-পরের দুদিনে পণ্যভর্তি কনটেইনার খালাস হয়েছে গড়ে দেড় হাজার। স্বাভাবিকের চেয়ে যা দুই-তৃতীয়াংশ কম। গত ৩১ জানুয়ারি কর্মবিরতি শুরু হলেও এর আগের দিন বন্দরের জেটিতে ২০ ফুট এককের আমদানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার ছিল ৩২ হাজার ১১১। কর্মবিরতির এক পর্যায়ে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ৩১২। এখন সেটি আরো বেড়ে হয়েছে ৪১ হাজার ৭২৫।

বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এমএ সালাম বলেন, বন্দরে আটকে থাকা জাহাজের বেশ কয়েকটিতে আমাদের শিল্পের কাঁচামাল আছে। আছে রমজানের পণ্যও। এগুলোর জট খুলতে আরো অন্তত ১০ দিন সময় লাগবে। এর মধ্যে যদি আরো জাহাজ বন্দরে নোঙর করে এ সময় আরো বাড়তে পারে। 

বন্দর পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, রমজানের পণ্য দ্রুত খালাস করতে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। টানা কর্মবিরতি ও নির্বাচনী ছুটির কিছুটা প্রভাব পড়েছে খালাস কার্যক্রমে। ভোটের আগে-পরে যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ ছিল। আবার পরিবহন শ্রমিকের অনেকে ভোট দিতে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। বন্দর খোলা থাকলেও এ সময় তুলনামূলক কম ছিল পণ্য খালাসের হার।

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.