দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেটের কারণে এমন অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার সকাল থেকেই একনাগাড়ে বৃষ্টি হয়েছে। ভোরের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পানি জমে একপ্রকার জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনের সকালে বাজার করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। ময়লা পানি মাড়িয়ে বাজারে পৌঁছালেও দামে স্বস্তি মেলেনি। কারণ, বাজারে এখন সবজির দাম বেশ চড়া। বিশেষত বেগুন ও কাঁকরোলের দাম নাভিশ্বাস তুলছে ক্রেতাদের।
শুক্রবার (১ মে) সকালে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, চিকন বেগুন কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর বড় গোল বেগুনের দাম আরও বেশি, কেজি ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা। একইভাবে কাঁকরোলের দামও বেশ চড়া। প্রতি কেজি কাঁকরোল বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা।
সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিপাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবজি উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে। কৃষকেরা সময়মতো ফসল তুলতে না পারায় এবং পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে খুচরা বাজারে।
এ দুই সবজির কেজি সেঞ্চুরি পার (১০০ টাকার ওপরে) হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য সবজিও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। টমেটো ৬০ থেকে ৭০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, পটোল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ঝিঙে ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। কাঁচা মরিচের কেজি ১২০ টাকা, করলা ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং লাউ প্রতিটি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচকলার হালি (৪টা) বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়।
মুরগির বাজারেও দাম কমেনি। ব্রয়লার মুরগি কেজি প্রতি ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা এবং সোনালী মুরগি ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের এই উচ্চমূল্যে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ বেড়েই চলেছে।
বিক্রেতাদের মতে, বৃষ্টির কারণে শুধু উৎপাদন নয়, পরিবহন খরচও বেড়েছে। ফলে বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিও বাজার অস্থিরতার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। ধান থেকে চাল উৎপাদন, খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন-প্রতিটি ধাপেই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল রয়েছে। ফলে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহ খরচও বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে বেড়েছে চালের দাম। বর্তমানে মোটা চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, মাঝারি চাল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা এবং মিনিকেট চাল প্রায় ৮৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় বেশি। একইভাবে ডালের দাম কেজিতে ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে, আর ডিমের দাম ডজনপ্রতি বেড়ে ১৩০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বৃষ্টি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দাম বাড়ানো হচ্ছে। তাদের মতে, সরবরাহ চেইনের বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় কিছু গোষ্ঠী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিশেষ করে ভোজ্যতেলের বাজারে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বর্তমানে বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজারে প্রায় অনুপস্থিত, ফলে খোলা তেলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে এবং তার দাম লিটারে ২০০ টাকার ওপরে উঠে গেছে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানি বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে পরবর্তীতে দাম বাড়ানো হচ্ছে। অথচ তদারকি সংস্থাগুলোর নজরদারি মূলত খুচরা পর্যায়েই সীমাবদ্ধ, বড় সরবরাহকারীদের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
মাছ ও মাংসের বাজারেও চিত্রও একই। গরুর মাংস কেজিতে ৮০০ টাকা, খাসির মাংস ১২০০ টাকা এবং মুরগির দাম ১৮০ থেকে ৩৬০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। মাছের দামও গত কয়েক দিনে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবার নিয়মিত মাছ বা মাংস কেনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ী আড়তের চাল ব্যবসায়ী মানিক হোসেন জানান, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়লেও কেজিতে ২-৩ টাকার বেশি বাড়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে ৫-৬ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে, যা অস্বাভাবিক। তার মতে, পাইকারি পর্যায়ের এই বাড়তি দামই খুচরা বাজারে আরও বেশি চাপ তৈরি করছে।
জিনজিরা কাঁচাবাজারের এক মুদি ব্যবসায়ী বলেন, তেলের বাজার পুরোপুরি কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। তারা যখন ইচ্ছা সরবরাহ কমিয়ে দেয়, আবার নিজেদের সুবিধামতো দাম বাড়ায়। অথচ তদারকি সংস্থাগুলো এসে খুচরা ব্যবসায়ীদের জরিমানা করে, মূল সমস্যার জায়গায় হাত দেয় না।
অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী মনে করেন, বাজার স্থিতিশীল করতে হলে প্রথমে সিন্ডিকেটের প্রকৃত কাঠামো চিহ্নিত করা জরুরি। তার মতে, উৎপাদনকারী, আমদানিকারক এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে কারা প্রভাব বিস্তার করছে তা খতিয়ে দেখতে হবে।
এম কে মুজেরী বলেন, ‘শুধু খুচরা পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে কোনো লাভ হবে না। বরং উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে খরচ, সরবরাহ এবং বিক্রয়মূল্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।’
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা ও জ্বালানি দামের প্রভাবে বাংলাদেশে নতুন করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, যা বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে আরও তীব্র হতে পারে।
তবে বাস্তবতা বলছে, বৃষ্টি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেট-এই তিনটি কারণ একসঙ্গে কাজ করায় বাজার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর নজরদারি, সরবরাহ চেইনে স্বচ্ছতা এবং শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া এই অস্থিরতা থেকে বের হওয়া কঠিন।
এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের একটাই প্রত্যাশা—বাজারে স্বস্তি ফিরে আসুক, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেন নাগালের মধ্যেই থাকে। কিন্তু সেই স্বস্তি কবে মিলবে, তা এখনো অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









