নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল অঙ্গনে নীরবে কিন্তু গভীরভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে শিল্পসংগঠন ‘চিত্রকৃৎ’। রঙ, তুলি আর ক্যানভাসের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে সংগঠনটি আজ ক্যাম্পাসজুড়ে শিল্প, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সমসাময়িক চেতনাকে জীবন্ত করে তোলার এক অনন্য নাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জাতীয় দিবস, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও বিশেষ মুহূর্তগুলোতে চিত্রকৃৎ-এর শিল্পকর্ম যেন নতুন প্রাণ এনে দেয় পুরো ক্যাম্পাসে। শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আলপনার রঙে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, বিজয় দিবসে লাল-সবুজের আবেগঘন দেয়ালচিত্র কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে বর্ণিল শিল্প আয়োজন—প্রতিটি কাজেই ফুটে ওঠে সংগঠনটির নান্দনিকতা ও দেশাত্মবোধ।
শুধু জাতীয় আয়োজনই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া উৎসবকেও শিক্ষার্থীদের কাছে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে চিত্রকৃৎ। বিশেষ করে ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি করা গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্র শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রিয় দল, ফুটবল সংস্কৃতি ও বিশ্বকাপের উন্মাদনাকে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরে সংগঠনটি সৃষ্টি করেছে এক ভিন্নমাত্রার উৎসবমুখর পরিবেশ।
চিত্রকৃৎ-এর কার্যক্রম কেবল শিল্প প্রদর্শনেই সীমাবদ্ধ নয়। নতুন শিল্পীদের জন্য এটি হয়ে উঠেছে একটি উন্মুক্ত ও প্রাণবন্ত প্ল্যাটফর্ম। চিত্রাঙ্কন প্রশিক্ষণ, স্কেচ সেশন, আর্ট ওয়ার্কশপ, রঙ মিক্সিং কর্মশালা ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে সংগঠনটি। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের একত্রিত করে শিল্পচর্চার মাধ্যমে গড়ে তুলছে বন্ধুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক এক সাংস্কৃতিক পরিবেশ।
চিত্রকৃৎ-এর সাধারণ সম্পাদক লিমা চৌধুরী বলেন, ‘‘চিত্রকৃৎ আমার কাছে শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, আবেগ ও সংস্কৃতিচর্চার এক প্রাণবন্ত পরিবার। আমরা সবসময় চেষ্টা করি রং তুলির মাধ্যমে ক্যাম্পাসকে শুধু নান্দনিকভাবে সাজাতে নয়, বরং প্রতিটি শিল্পকর্মের মাধ্যমে একটি গল্প, একটি বার্তা কিংবা শিক্ষার্থীদের অনুভূতি তুলে ধরতে। বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুধু একাডেমিক কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ, সৃজনশীল চিন্তাভাবনা ও সাংস্কৃতিক চর্চাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকেই চিত্রকৃৎ কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের সদস্যরা নিজেদের পড়াশোনার পাশাপাশি সময় ও শ্রম দিয়ে ক্যাম্পাসকে আরও সুন্দর ও প্রাণবন্ত করে তোলার চেষ্টা করছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আলপনা, বিজয় দিবসে শহীদ মিনারের সামনে শিল্পকর্ম, জুলাই গ্রাফিতি কিংবা Angry মামার টং-এর আর্ট— প্রতিটি কাজের পেছনেই ছিল সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও দলগত প্রচেষ্টা। সম্প্রতি বিশ্বকাপ উপলক্ষে করা গ্রাফিতিও শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এসব কাজ আমাদের অনুপ্রাণিত করে আরও নতুন কিছু করার জন্য। আমরা বিশ্বাস করি, শিল্প মানুষের মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি সুন্দর ও শিল্পসমৃদ্ধ ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক চিন্তা, সৌন্দর্যবোধ ও সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশে সহায়তা করে। চিত্রকৃৎ সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে, যাতে নোবিপ্রবির প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি প্রাঙ্গণ শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘ভবিষ্যতে আমরা আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চাই। নতুন নতুন দেয়ালচিত্র, গ্রাফিতি, আলপনা ও সৃজনশীল আয়োজনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসকে আরও রঙিন ও প্রাণবন্ত করে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। একইসঙ্গে নতুন শিক্ষার্থীদের শিল্পচর্চায় আগ্রহী করে তোলা এবং তাদের জন্য একটি মুক্ত ও ইতিবাচক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাও আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।
সবশেষে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষকবৃন্দ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই, যারা সবসময় আমাদের কাজকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়ে আসছেন। সবার সহযোগিতা ও ভালোবাসা নিয়েই চিত্রকৃৎ ভবিষ্যতেও নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসকে রঙের ছোঁয়ায় আরও জীবন্ত করে তুলবে বলে আমরা আশাবাদী।’’
চিত্রকৃৎ এর সভাপতি শান্তা দেবনাথ বলেন, ‘‘আমার কাছে চিত্রকৃৎ এমন একটি পরিবার, যেখানে শিল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অনুভূতি ও ভাবনাকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা খুঁজে পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিল্পচর্চা, কল্পনা ও সৃজনশীলতাকে বিকশিত করার লক্ষ্য নিয়েই চিত্রকৃৎ পথচলা শুরু করেছে এবং আজও সেই স্বপ্ন নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে। চিত্রকৃৎ-এর মূল লক্ষ্য হলো নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে ভিজ্যুয়াল আর্টস চর্চাকে সমৃদ্ধ করা এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে শিল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি নিজেদের সৃজনশীল দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পাক। একইসঙ্গে নতুন শিল্পীদের স্বীকৃতি প্রদান, শিল্পভিত্তিক একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক চেতনা গড়ে তোলাও আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।’’
তিনি বলেন, এছাড়াও শিল্পের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, উৎসবগুলোকে আরও বর্ণিল করা এবং ভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মাঝে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাও চিত্রকৃৎ-এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এ লক্ষ্যেই আমাদের সদস্যরা নিরলস পরিশ্রম করে নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে শিল্পচর্চাকে প্রাণবন্ত করে তুলতে বছরজুড়ে নানা ধরনের সৃজনশীল কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। আমাদের অন্যতম কাজ হলো ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দেয়াল, প্রাঙ্গণ ও উন্মুক্ত স্থানকে শিল্পের ছোঁয়ায় নান্দনিক করে তোলা। বাংলা নববর্ষের আলপনা, জাতীয় দিবসগুলোতে দেশাত্মবোধক চিত্রকর্ম, বিভিন্ন সামাজিক বার্তাভিত্তিক গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের মাঝে শিল্প ও সচেতনতার সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘সম্প্রতি ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে একটি গ্রাফিতি করা হয়েছে যা ব্যাপক সারা ফেলেছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। এছাড়াও বিভিন্ন আর্ট ওয়ার্কশপ, স্কেচ সেশন, রঙ মিক্সিং কর্মশালা, প্রদর্শনী ও সৃজনশীল আয়োজনের মাধ্যমে নতুন শিল্পীদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা হয়। চিত্রকৃৎ সবসময় এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চায়, যেখানে একজন শিক্ষার্থী কোনো সংকোচ ছাড়াই নিজের প্রতিভা প্রকাশ করতে পারে। এখানে আমরা একে অপরের কাছ থেকে শিখি, একসাথে কাজ করি এবং নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস পাই। এই পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ, যারা সবসময় আমাদের কাজকে সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা দিয়ে আসছেন।
সবার ভালোবাসা, সমর্থন ও অনুপ্রেরণাকে সঙ্গে নিয়েই চিত্রকৃৎ ভবিষ্যতেও নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসজুড়ে সৃজনশীলতার আলো ছড়িয়ে দেবে—এই বিশ্বাস আমাদের এগিয়ে চলার সবচেয়ে বড় শক্তি।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









