এক সময় পৃথিবীতে নতুন ভূখণ্ড দখল, সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানা নিয়ে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই প্রতিযোগিতা এখন পৌঁছে গেছে মহাকাশে। আর সেই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদ। বিশেষ করে চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলকে ঘিরে বর্তমানে বিশ্বের দুই পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন এক মহাকাশ প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা শুধু বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভবিষ্যতের অর্থনীতি, জ্বালানি, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং মহাকাশে স্থায়ী উপস্থিতি গড়ে তোলার স্বপ্ন।
ষাট বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে ‘চাঁদে যাওয়ার দৌড়’ শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত জয় করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো-১১ অভিযানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রাখে। সেই সময় চাঁদে পৌঁছানো ছিল প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক। কিন্তু তখনকার লক্ষ্য ছিল মূলত চাঁদে পৌঁছানো এবং নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসা। সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস বা সম্পদ ব্যবহার করার কোনো বড় পরিকল্পনা ছিল না।
বর্তমান সময়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন চাঁদে যাওয়ার লক্ষ্য শুধু পতাকা গেড়ে ফিরে আসা নয়। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, চাঁদের দক্ষিণ মেরুর বিভিন্ন গহ্বরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পানির বরফ রয়েছে। এই বরফ ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হতে পারে। কারণ এই বরফ গলিয়ে পানীয় জল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। একই সঙ্গে পানি থেকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আলাদা করে রকেটের জ্বালানি তৈরি করা যায়। ফলে চাঁদে যদি পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায়, তাহলে সেখানেই জ্বালানি উৎপাদন করে আরও দূরের গ্রহ বা মহাকাশে অভিযান পরিচালনা করা অনেক সহজ হবে।
তবে সমস্যা হলো, এই বরফ চাঁদের সব জায়গায় সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় এর অস্তিত্বের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তাই এসব এলাকা ভবিষ্যতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এখন এমন স্থানগুলোকে নিজেদের গবেষণা ও ভবিষ্যৎ ঘাঁটি স্থাপনের জন্য উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করছে। এর ফলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে চাঁদের এই গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো নিয়ে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।
এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আবার মানুষকে চাঁদে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে একটি স্থায়ী মানবঘাঁটি গড়ে তোলা। সেখানে বিজ্ঞানীরা পালাক্রমে কাজ করবেন, যেমনটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা অ্যান্টার্কটিকার গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে দেখা যায়। এই ঘাঁটি ভবিষ্যতে শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য নয়, বরং মহাকাশ ভ্রমণের নতুন কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
অন্যদিকে চীনও দ্রুত গতিতে নিজেদের মহাকাশ কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে দেশটি সফলভাবে নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন পরিচালনা করছে, চাঁদের দূরবর্তী অংশ থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করেছে এবং একের পর এক সফল রোবোটিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এখন চীন রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশের সহযোগিতায় ‘ইন্টারন্যাশনাল লুনার রিসার্চ স্টেশন’ নামে একটি স্থায়ী চন্দ্রঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। তাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে মানুষকে চাঁদে পাঠানো এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে দক্ষিণ মেরু এলাকায় গবেষণা কেন্দ্র নির্মাণ শুরু করা।
তবে চাঁদে বসবাস বা কাজ করা মোটেও সহজ নয়। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর যেসব গহ্বরে বরফ রয়েছে, সেখানে সূর্যের আলো কখনোই পৌঁছায় না। ফলে তাপমাত্রা মাইনাস ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে নেমে যায়। এমন পরিবেশে মানুষ ও যন্ত্রপাতি সচল রাখতে বিশেষ প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সৌরশক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করাও সম্ভব নয়, কারণ সেখানে দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো থাকে না। তাই বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক শক্তিসহ বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারের পরিকল্পনা করছেন।
শুধু বসবাসই নয়, চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়তে হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পরিবহন, খনন কাজ এবং বিকিরণ থেকে সুরক্ষার মতো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বিজ্ঞানীরা এমন ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন, যার একটি অংশ মাটির নিচে থাকবে। এতে মহাজাগতিক বিকিরণ এবং ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের আঘাত থেকে মানুষ নিরাপদ থাকবে। একই সঙ্গে বিশেষ যানবাহনের মাধ্যমে মহাকাশচারীরা ভারী স্পেসস্যুট ছাড়াই দীর্ঘ সময় গবেষণা করতে পারবেন।
চাঁদ নিয়ে এই প্রতিযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈজ্ঞানিক গবেষণা। চাঁদের দূরবর্তী অংশ পৃথিবীর রেডিও তরঙ্গ থেকে অনেকটাই মুক্ত। ফলে সেখানে অত্যাধুনিক রেডিও টেলিস্কোপ স্থাপন করা হলে মহাবিশ্বের অত্যন্ত দুর্বল সংকেতও শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এছাড়া চাঁদের কম মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহ কিংবা সৌরজগতের আরও দূরের গন্তব্যে মহাকাশযান পাঠানোকে সহজ করে তুলতে পারে। পৃথিবী থেকে সরাসরি যাত্রা করার পরিবর্তে চাঁদকে একটি মহাকাশ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা গেলে সময়, জ্বালানি এবং ব্যয়—সবই কমে আসবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দুই দশকে মহাকাশ গবেষণার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে চাঁদ। তাই এই প্রতিযোগিতা কেবল দুই দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরীক্ষা নয়; এটি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নেতৃত্বের লড়াইও। যে দেশ আগে চাঁদে স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারবে এবং সেখানকার সম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করবে, ভবিষ্যতের মহাকাশ অর্থনীতিতে তার অবস্থান অনেক শক্তিশালী হবে।
তবে এই প্রতিযোগিতা যেন সংঘাতের রূপ না নেয়, সে বিষয়েও সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, চাঁদ সমগ্র মানবজাতির সম্পদ। তাই এর ব্যবহার ও গবেষণা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং শান্তিপূর্ণ নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। অন্যথায় পৃথিবীর মতো মহাকাশেও সম্পদ ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই নতুন প্রতিযোগিতা তাই শুধু মহাকাশ অভিযানের গল্প নয়। এটি ভবিষ্যতের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, জ্বালানি, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আগামী কয়েক বছরে এই প্রতিযোগিতা কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে মানবজাতির মহাকাশ অভিযানের পরবর্তী ইতিহাস।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









