ঈদুল আজহা মানেই ত্যাগের মহিমা, আত্মশুদ্ধি আর সব ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়ানোর উৎসব। আর এই উৎসবের রঙে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) অমুসলিম শিক্ষার্থীদের ঈদ-ভাবনায় সম্প্রীতির বার্তা।
ক্যাম্পাসের এই শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদ কেবল মুসলিম বন্ধুদের ধর্মীয় আচার নয়, বরং তা সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার এক বড় উপলক্ষ। ধর্মের ভিন্নতা যেখানে কোনো দেয়াল তুলতে পারেনি, বরং তৈরি করেছে পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক মজবুত সেতু।
ঈদকে ঘিরে এমনই কয়েকজন শিক্ষার্থীর অনুভূতির কথা তুলে ধরেছেন দৈনিক এদিন-এর ইবি প্রতিনিধি শিহাব উদ্দিন।
উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী সৃষ্টি পালের ভাষায়, “ঈদ মূলত মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব হলেও এর আনন্দ ছুঁয়ে যায় আমাদের সবাইকে। এই ছুটিতে অমুসলিম শিক্ষার্থীরাও বন্ধুদের বাসায় ঘুরতে যায়, নানা রকম খাবারে আপ্যায়িত হয় এবং আনন্দের ভাগীদার হয়। আমরা যেমন বন্ধুদের ঈদের শুভেচ্ছা জানাই, তেমনি অনেকেই একসঙ্গে ঘুরতে বের হই। অনেকের কাছেই ঈদ মানে বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার সম্পর্ককে আরও গভীর করার উপলক্ষ। ধর্ম ভিন্ন হলেও উৎসবের চিরন্তন হাসি ও আন্তরিকতা আমাদের সবাইকে যেন এক সুতোয় বেঁধে ফেলে।”
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মহিতোষ দাস বলেন, “ঈদ মানেই সব ক্লান্তি ভুলে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা। ট্রেনের ধকল বা বাসের ভিড় সয়ে বাড়ি পৌঁছানোর আনন্দের কাছে পৃথিবীর সব বিলাসিতাই তুচ্ছ। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো বন্ধ হয়, তখন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের সবাইকে ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়। একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী হিসেবে এই ছুটি আমার কাছেও পরিবারের সাথে কাটানোর দারুণ সুযোগ। তবে ঘরে বসে চারপাশের ঈদের আনন্দ দেখার সময় মনটা বারবার প্রিয় ক্যাম্পাসে ছুটে যায়। মনে পড়ে ছুটির আগের দিনগুলোর কথা—মুসলিম বন্ধুদের বাড়ি ফেরার আনন্দ কীভাবে আমাদেরও ছুঁয়ে যেত।’’
তিনি বলেন, ‘‘নিজের ধর্মীয় উৎসবের বাইরে বন্ধুদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করাটা কখন যে জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে, তা আজ দূরে বসে তীব্রভাবে অনুভব করছি। আজ সবাই নিজ নিজ পরিবারে থাকলেও মিস করছি ক্যাম্পাসের সেই বন্ধুদের, যাদের নিয়ে হলে আমাদের আরেকটি ‘পরিবার’ গড়ে উঠেছিল। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় গড়ে ওঠা ভালোবাসার টান যে কত গভীর, উৎসবের দিনে বন্ধুদের এই শূন্যতা তা আরও বেশি মনে করিয়ে দিচ্ছে।”
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উর্মি শীল বলেন, “ঈদ আমার কাছে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং ভালোবাসা, সম্প্রীতি আর একসাথে আনন্দ ভাগাভাগি করার এক দারুণ উপলক্ষ। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর দেখেছি, ঈদের আগে পুরো ক্যাম্পাস এক অন্যরকম আবহে ভরে ওঠে। বন্ধুদের বাড়ি ফেরার আমেজ আর উৎসবের পরিকল্পনা দেখতেও খুব সুন্দর লাগে। অমুসলিম শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, এই উৎসব আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও গভীর করে। বন্ধুদের ঈদের শুভেচ্ছা জানানো এবং তাদের আনন্দের অংশীদার হওয়া—আমাদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্মানের বন্ধন তৈরি করে। ধর্ম ভিন্ন হলেও উৎসবের আনন্দ আসলেই সবার জন্য সমান।”
উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী ইস্পিতা সরকারের ভাষায়—‘ধর্ম যার যার, উৎসব আমাদের সবার’। তিনি বলেন, “ঈদ মুসলমানদের বড় ধর্মীয় উৎসব হলেও ক্যাম্পাসে এর আবহ কেবল নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে পারস্পরিক সম্প্রীতির এক মহোৎসব। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অমুসলিম শিক্ষার্থী হিসেবে ঈদের দিনগুলোতে মুসলিম বন্ধুদের বাড়ি যাওয়া, আড্ডা, সেমাই খাওয়া আর সবাই মিলে ঘুরতে বের হওয়ার আনন্দই আলাদা।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমার মতে, ঈদের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো সম্পর্কের উষ্ণতা। ধর্ম আলাদা হলেও বন্ধুত্বের জায়গায় কোনো দূরত্ব থাকে না, বরং এই উৎসবের মাধ্যমে বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। দিনশেষে প্রতিটি উৎসবই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এর প্রকৃত সৌন্দর্য মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার মাঝেই নিহিত। ধর্ম যার যার, উৎসব আমাদের সবার। সবাইকে ঈদ মোবারক।”
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চার শিক্ষার্থীর নিটোল অনুভূতিগুলো যেন এক চিলতে সম্প্রীতির বাংলাদেশ; যেখানে উৎসবের আনন্দ কোনো কাঁটাতারে বন্দি না হয়ে ত্যাগের মহিমা আর পারস্পরিক ভাগাভাগির সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে। একাত্মতার এই মজবুত সুবাস ছড়িয়ে পড়ুক গোটা দেশে—ঈদের এই মহতী লগ্নে এটাই হোক সবার প্রত্যাশা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









