বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা,ব্যাবসা এমনকি ছোটো-ছোট কাজ থেকে শুরু করে বড় ধরনের বিভিন্ন কাজে ব্যাবহার করা হচ্ছে। সমাজের প্রায় প্রতিটি খাতে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মায়াজাল।
বিশেষ করে গবেষণার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাবহার গবেষণার গতি, পদ্ধতি এবং ফলাফলে নতুন মাত্রা যোগ করে দিয়েছে। তবে এই প্রযুক্তির নৈতিক ও সঠিক ব্যাবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং ইউজিসি পিএইচডি ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক ফায়াজুন্নেসা চৌধুরী তার নতুন একটি বই 'Artificial Intelligence in Mordern Research: Tools, Techniques, Ethics and Applications' প্রকাশ করেছেন।
বর্তমানে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষকতা করছেন ফায়াজুন্নেসা চৌধুরী। শিক্ষকতা, গবেষণা, লেখালেখি এবং পিএইচডি গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন কিভাবে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি গবেষণার ধরন, গতিবিধি নতুনভাবে পরিবর্তন করছে। গবেষণার কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যেমন রয়েছে অসীম সম্ভাবনা, তেমনই ছুড়ে দেয় নানা ধরনের প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই রচনা করা হয়েছে এই বইটি।
লেখকের মতে,'বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এখন শুধুমাত্র একটা প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম হিসেবে দেখা হয়না। বরং এটি গবেষণার পুরো প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। গবেষণার বিষয় নির্বাচন, তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে সাহিত্য পর্যালোচনা, তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণাপত্র লেখা, এমনকি প্রকাশনার প্রস্তুতিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে মুদ্রার উলটো পিঠের মতো, এর ব্যাবহারের পাশাপাশি বেড়েছে নৈতিকতা ও একাডেমিক সততার চ্যালেঞ্জও। তাই প্রযুক্তি ব্যাবহারের পাশাপাশি সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও আমাদের আমলে নেওয়া অতীব জরুরি।'
এছাড়াও বইটির অন্যতম ও বিশেষ দিকও রয়েছে। উল্লেখযোগ্য হলো এটি গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাবহারিক দিকগুলোর পাশাপাশি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছে। বইটিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে,কিভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যাবহার করে সাহিত্য পর্যালোচনা, সেমান্টিক অনুসন্ধান, উদ্ধৃতি ব্যবস্থাপনা, তথ্য সংগ্রহ, তথ্য পরিশোধন, পরিমানগত ও গুনগত বিশ্লেষণ, একাডেমিক লেখা, চৌর্যবৃত্তি সম্পর্কে সচেতনতা, গবেষণা নৈতিকতা এবং প্রকাশনা প্রস্তুতি আরও কার্যকর ও দক্ষতার সাথে সম্পুর্ন করা যায়।
ফায়াজুন্নেসা চৌধুরী জানান, "বইটি মূলত শিক্ষার্থী, গবেষক, শিক্ষক, গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক, ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্ট এবং নতুন গবেষণা শুরু করতে আগ্রহীদের কথা মাথায় রেখে লেখা হয়েছে। গবেষণার শুরুতে অনেকেই রিসার্চ গ্যাপ নির্ধারণ, সাহিত্য পর্যালোচনা পরিচালনা, তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা থিসিস ও জার্নাল আর্টিকেল লেখার মতো বিষয়গুলো নিয়ে দ্বিধায় থাকেন। এই বইটি তাঁদের জন্য একটি সহজ, ব্যবহারিক এবং ধাপে ধাপে সাজানো পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করতে পারে। ভবিষ্যতে যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বুঝতে,প্রশ্ন করতে, যাচাই করতে এবং একাডেমিক সততার সাথে প্রয়োগ করতে পারবে,সেই ভবিষ্যতের গবেষণায় সফল হবে।"
বইটি লেখার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে লেখক তার পিএইচডি সুপারভাইজার অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গালিবের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, "তাঁর দিকনির্দেশনা ও গবেষণামূখী চিন্তা লেখককে গবেষণার গভীরতা ও গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি দিয়েছে।"
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যাবহার করতে আমরা আগ্রহী, গবেষণায় শর্টকাট পথ খুজতে। তবে লেখক এই ধারনার সাথে দ্বিমত হয়ে বলেছেন, ' কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষকের এক অনন্য সহকারী হতে পারে, কিন্তু গবেষকের চিন্তাশক্তি,বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও নৈতিক দায়িত্ববোধের বিকল্প কোনকিছু হতে পারেনা। ঠিক তেমনই,এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে এমনকি সময় বাঁচাতে পারে। কিন্তু গবেষণার প্রশ্ন কেমন হবে,যুক্তির ব্যাখ্যা কেমন হবে এবং চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব শুধুমাত্র মানুষের হাতেই ন্যাস্ত।'
লেখকের মতে, 'গবেষণা শুধুমাত্র ডিগ্রী অর্জনের বিষয় না। এটি জ্ঞান,সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা দায়িত্ব।'
আমাদের বাংলাদেশে গবেষণাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যাবহার নিয়ে সচেতনতা তৈরীতে এই বইটি হতে পারে অনন্য পাথেয়। বিশেষ করে তরুণ গবেষকদের জন্য এই বইটি গবেষণার সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ধারনার হাতিয়ার হতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণায় প্রযুক্তির যথাযথ ব্যাবহার ও একাডেমিক সততার গুরুত্ব সম্পর্কেও সচেতনতা তৈরীতে সহায়তা করবে।
লেখক ও পাঠকের আশা, গবেষণা ও জ্ঞান চর্চার জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক ব্যাবহারের বার্তা ছড়িয়ে দিতে বইটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









