দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার গুণগত মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে গঠিত একমাত্র রাষ্ট্রীয় ও স্বায়ত্তশাসিত কর্তৃপক্ষ ‘বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল’। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং মানদণ্ড টিকিয়ে রাখতে এই কাউন্সিলের স্বীকৃতি বা অ্যাক্রেডিটেশন থাকা জরুরি। তবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) এটি ধীরগতিতে প্রক্রিয়াধীন থাকায় ৩৮টি একাডেমিক বিভাগের মধ্যে এখন পর্যন্ত একটি বিভাগও চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রীয় গুণগত মানের স্বীকৃতি বা অ্যাক্রেডিটেশন অর্জন করতে পারেনি।
বিভিন্ন বিভাগ সূত্রে, স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ‘প্রাথমিক আবেদন’ বা সেলফ-অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে দেখা গেছে সদিচ্ছার অভাব ও উদাসীনতার চিত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৩৮টি বিভাগের মধ্যে মাত্র ২০টি বিভাগ এখন পর্যন্ত প্রাথমিক আবেদন প্রক্রিয়া প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, বাকি ১৮টি বিভাগ এখনও এই প্রক্রিয়াই শুরু করেনি, যা মোট বিভাগের প্রায় অর্ধেক। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বেশিরভাগ বিভাগের এমন পিছিয়ে থাকা এবং অনীহা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, এই স্থবিরতার পেছনে মূলত প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছার অভাব এবং কাঠামোগত দুর্বলতা দায়ী। বিভাগের সিনিয়র শিক্ষকেরা এই দীর্ঘমেয়াদি এবং জটিল ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেয়ে প্রচলিত নিয়মে চলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন বলে জানা যায়। আবার তুলনামূলক নতুন বা মাঝারি মানের বিভাগে রয়েছে শিক্ষক সংকট, সেশনজট এবং আধুনিক ল্যাবরেটরি বা লজিস্টিক সাপোর্টের অভাব। বিএসি-র কঠোর শর্তপূরণ করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায়, অনেক বিভাগ আবেদন করেও নেতিবাচক মূল্যায়নের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে পিছিয়ে থাকার শঙ্কা করছে। মূলত রুটিনমাফিক ক্লাস ও পরীক্ষা শেষ করতেই হিমশিম খাচ্ছে, মানোন্নয়নের এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া বাড়তি চাপ মনে করছে তারা। এই পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারকে একধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পড়াশোনা শেষ করে যখন তারা দেশীয় বা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে যাবেন কিংবা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে আবেদন করবেন, তখন এই অ্যাক্রেডিটেশন না থাকাটা তাদের ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় তারা বিশ্বমানের শিক্ষার্থীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বেন। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে অ্যাক্রেডিটেশন না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি বাজেট বরাদ্দ এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ নাজিমুদ্দিন বলেন, “শুরুর দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলকভাবে পুরাতন ২০টি বিভাগ বিএসি অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য আবেদন করার কথা থাকলেও নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে আগামী সপ্তাহের দিকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অবলম্বন করে বিএসি অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য আবেদন করবে। যদিও সকল বিভাগ বিএসি অ্যাক্রেডিটেশন পাওয়ার শর্ত পূরণ করার সক্ষমতা অর্জন করেনি, তবুও অ্যাসেসমেন্টের জন্য আবেদন করবে। এরপর ২ বছর লাগুক কিংবা ৫ বছর লাগুক একসময় তারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হবে এবং অ্যাক্রেডিটেশন পাবে। উচ্চশিক্ষার মান রক্ষায় দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন করুক বা না করুক, আমরা বিএসি'র স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে দেখছি।”
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের অধীনে আয়োজিত কর্মশালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মতিনুর রহমান বলেছেন, “অ্যাক্রেডিটেশন অর্জন ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হলে একাডেমিক উৎকর্ষ ও সুশাসন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক মূল্যায়নের জন্য শিক্ষকদের প্রোফাইল ও ওয়েবসাইট আধুনিকায়ন করতে হবে। পাশাপাশি, নীতিমালার আলোকে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি দক্ষ ও মানসম্পন্ন ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।”
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “অ্যাক্রেডিটেশন না নিলে সরাসরি বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন না হলেও বিভাগগুলোর আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত ও কোয়ালিটি ইমপ্রুভ হয় না। অ্যাক্রেডিটেশন ছাড়া প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা যখন উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাবে তখন নানা ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। আমাদের দেশের ব্যাচেলর লেভেলকে তাদের দেশের ব্যাচেলর লেভেলের সমমান হিসেবে বিবেচনা করে না। এটা কিছুদিন পর দেশে ও বিদেশে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। এখন যেসকল বিভাগগুলো অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য আবেদন করতেছে না তারা মূলত তাদের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।”
এটি নিতে গেলে কী কী শর্ত পূরণ করতে হয় মর্মে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট নীতিমালা দেওয়া আছে। নির্দিষ্ট কারিকুলাম, ইকুইপমেন্ট ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় রেখে চলতে হবে। সাধারণত সদিচ্ছার অভাবে এটা হয়ে ওঠে না।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









