প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচন। তিন দফা পিছিয়ে অবশেষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনের ভোট গ্রহণ আগামীকাল মঙ্গলবার। নির্বাচন কমিশনের দাবি, ভোট নিয়ে আর কোনো শঙ্কা নেই। প্রার্থীদের প্রত্যাশা, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও নিরাপদ নির্বাচন। তারা মনে করছেন, স্বচ্ছ ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, আমরা চাই যারা নির্বাচিত হবে তারা যেন আমাদের এ আশা প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারে। তারা আরও বলেন, সেসব প্রার্থীকেই নির্বাচিত হিসেবে দেখতে চাই তারা, আসলে নির্বাচিত হওয়ার পর জগন্নাথের জন্য কাজ করবে যারা।
শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের এই সুযোগ শুধু ক্যাম্পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রতিফলন পড়তে পারে জাতীয় রাজনীতিতেও। কারণ, ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে অনেকেই জাতীয় নির্বাচনের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ হিসেবে বিবেচনা করেন। অপরদিকে জকসুর এ নির্বাচনের মাধ্যমে কেবল প্রতিনিধি নির্বাচনই নয়, জাতীয় রাজনীতির প্রতি নিজেদের প্রত্যাশাও প্রকাশ করবেন বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ছাত্ররাজনীতির গতিপথ অনেক সময় জাতীয় রাজনীতিকেও প্রভাবিত করে। আন্দোলন, প্রতিবাদ কিংবা ভোটের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা বারবার উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে।
অন্যদিকে, কোনো বিশৃঙ্খলা বা অনিয়ম হলে সেটি জাতীয় নির্বাচন ঘিরে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে জাতীয় নির্বাচনের প্রত্যাশা ও আশঙ্কা—দুটোই তুলে ধরছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জকসুর নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি প্রভাব না ফেললেও অনেকাংশে রয়েছে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা। ফলে জকসুর জয়ে জাতীয় নির্বাচনে আত্মবিশ্বাসী হয় ওঠতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো।
গত ৩০ ডিসেম্বর জকসুর ভোট গ্রহণের দিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু খবর এলে নির্বাচন স্থগিত করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বারবার নির্বাচন পেছানোয় সেদিন প্রতিবাদও করে শিক্ষার্থীরা। নির্বাচন স্থগিতের পেছনে বড় দুটি সংগঠন, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল একে অপরকে দায়ী করলেও প্রশাসনের দাবি, কোনো পক্ষের চাপে নয়; সিন্ডিকেট সভায় সবার মতামতের ভিত্তিতেই নির্বাচন স্থগিত করা হয়। অবশেষে ৬ জানুয়ারি ভোট গ্রহণের জন্য নতুন তারিখ ধার্য করা হয়।
পুরানো ঢাকার সাড়ে সাত একরের এ ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে—যা শিক্ষার্থীদের আবেগে পরিণত হয়েছে। ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা বলছেন, আর কোনো টালবাহানা নয় ৬ জানুয়ারিতেই হতে হবে নির্বাচন। জকসু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি। সেই জায়গা থেকে ৬ তারিখ ডু অর ডাই।
বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের প্রতিনিধিসহ সব সিন্ডিকেট সদস্য নির্বাচন আয়োজনে ইতিবাচক মতামত দিয়েছে। নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বাহাদুর শাহ পার্কে পুলিশের কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের নির্বাচন কমিশন বলছে, নির্বাচন নিয়ে আর কোনো শঙ্কা নেই। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। জকসু প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান বলেন, আমরা জকসু নির্বাচন করার ব্যাপারে পুরোপুরি প্রস্তুত। ইলেকশন কমিশনের পক্ষ থেকে সব রকম প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
ছাত্রশিবির সমর্থিত অদম্য জবিয়ান ঐক্য প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, শুরু থেকেই আমাদের প্রচারণা ছিল জোরদার। নিয়মিত ক্যাম্পাসে আসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছি, তাদের সমস্যা শুনেছি এবং নির্বাচন নিয়ে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। তবে নির্বাচন কমিশন ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আমাদের কিছুটা সংশয় রয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের প্রত্যাশা করছি।
ছাত্রদল সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী খাদিজাতুল কোবরা বলেন, প্রচারণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে খুব ভালো সাড়া পেয়েছি। এখন একটাই প্রত্যাশা একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরাপদ নির্বাচন। অন্যান্য ক্যাম্পাসে যে ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়েছে, তা কোনোভাবেই আমরা চাই না।
জাতীয় ছাত্রশক্তি সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান প্যানেলের এজিএস পদপ্রার্থী শাহীন মিয়া বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পেয়েছি। যেখানে গিয়েছি, শিক্ষার্থীরা বলেছে আমরা সবসময় ক্যাম্পাসের জন্য কাজ করেছি। সব মিলিয়ে আমরা আশাবাদী। আমরা সবসময়ই সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। তবে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আমাদের বারবার হতাশ করেছে। আশা করি, নির্বাচনের দিন আগের সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে না।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট সমর্থিত মওলানা ভাসানী ব্রিগেড প্যানেলের এজিএস পদপ্রার্থী শামসুল আলম মারুফ বলেন, আমরা প্রচারণার জন্য খুব কম সময় পেয়েছি। এরপরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পেয়েছি এবং নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী। তবে নির্বাচন কতটা ফেয়ার হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাসান মিয়া বলেন, এটা আমার প্রথম ভোট। এজন্য অনেক বেশি উৎসুক। তবে এমন কোনো কিছু দেখতে চাই না যার মাধ্যমে নির্বাচন পরিবেশ নষ্ট হয়। আরেক শিক্ষার্থী সাহেদ সিজান বলেন, যেকোনো নির্বাচনে সবসময় একটা ঝামেলা থাকেই। কিন্তু আমি এটা প্রত্যাশা রাখবো যে একটা সঙ্কামুক্ত নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উপহার দেবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ১৬ হাজার ৬৪৫ জন। একমাত্র হল সংসদ নির্বাচনে ভোটার ১ হাজার ২৪২ জন আবাসিক শিক্ষার্থী। মোট ৩৯টি কেন্দ্রে স্থাপন করা হবে ১৭৮টি বুথ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ ভোটারের জন্য থাকছে একটি করে বুথ। ভোট গ্রহণ চলবে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









