একাডেমিক ভবনগুলোর করিডোরে এখন আর কারো পায়ের শব্দ নেই। তাড়াহুড়ো করে ক্লাস-পরীক্ষা ধরতে যাওয়ার নেই ব্যস্ততা। আকাশছোঁয়া গগনশিরীষের সারি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্যারিস রোডও এখন বড্ড একাকী। তবে, সবচেয়ে বেশি শূন্যতা খোলা আকাশের নিচে ইবলিশ মাঠ, হবিবুর মাঠ ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। যেখানে রমজানের বিকেলে চলতো গোল হয়ে বসে ইফতারের আয়োজন, মুড়ি-পেঁয়াজুর ভাগাভাগি আর বন্ধুত্বের আড্ডা সেখানে এখন কেবলই নিস্তব্ধতা।ক্যাম্পাসকে বিদায় জানিয়ে শিক্ষার্থীরা এখন নাড়ির টানে শেকড়ের ঠিকানায়। এই ফেরার পেছনে রয়েছে এক মহিমান্বিত কারণ—পবিত্র ঈদুল ফিতর।
দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসা এই দিনটি একেকজনের কাছে ধরা দেয় একেক রঙে। পরিবার থেকে দূরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ প্রজন্মের কাছে এই উৎসব হয়ে ওঠে ঘরে ফেরার, শৈশবের স্মৃতিকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার এবং আত্মোপলদ্ধির সন্ধিক্ষণ।
উচ্চশিক্ষা কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকায় বছরের বেশিরভাগ সময়ই পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয় তাদের। তবে,পবিত্র মাহে রমজান ও ঈদ উপলক্ষে গত ৬ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত টানা ২৩ দিনের ছুটিতে বাড়িতে ফিরেছে তারা।
ঈদের দিনের অনুভূতি জানতে চাইলে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল আলম বলেন, ঈদ মানেই আনন্দ আর প্রিয়জনদের সাথে মিলেমিশে থাকার এক অপার্থিব সুখ। ছুটির টানে আমরা অনেকে বাড়িতে ফিরি, আবার কেউ হয়তো প্রয়োজনে ক্যাম্পাসেই থেকে যাই। তবে স্থান যেখানেই হোক, ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হলো ভালোবাসা আর একে অপরের পাশে দাঁড়ানো। উৎসবের এই মুহূর্তগুলোতে আমাদের উচিত দুঃখী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কথা মনে রাখা। সবার মাঝে আনন্দ ভাগাভাগি করার মাধ্যমেই আমাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় ও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
পরিবার ছেড়ে শিল্পনগরী খুলনা থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগে পড়াশোনা করছেন রাকিব হাসনাত। প্রথম বর্ষে পড়ুয়া এই শিক্ষার্থীর কাছে ঈদের দিনের অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঈদে ক্যাম্পাস থেকে প্রথমবারের মতো বাসায় ফেরার অনুভূতিটা একেবারেই আলাদা। প্রিয়জনদের সাথে দেখা করার আনন্দ, আর বন্ধুদের সাথে বিদায়ের মুহূর্ত সব মিলিয়ে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। ঈদের প্রকৃত সার্থকতা লুকিয়ে থাকে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে। আমাদের আশেপাশে যারা অভাবের কারণে আনন্দ থেকে বঞ্চিত, তাদের পাশে দাঁড়ানোই এই উৎসবের সৌন্দর্য।
এদিকে রাজশাহীর মার্কেটে টানা ২০ দিন গিয়েও ঈদের কেনাকাটা করতে মন সায় দেয়নি নাফিসা আঞ্জুম মৃদুলার। ফোকলোর এন্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীর কাছে মায়ের সাথে ঈদের কেনাকাটা করার অভ্যেসটাই এখনো বদলায়নি।
তিনি বলেন, ঈদের দিনের আনন্দের জন্য আমরা কত ধরনের যে প্রস্তুতি নেই সেটা একা থাকলে অনুভব করা যায়না । রাজশাহীতে ২৩ রোজা পর্যন্ত থেকেছি এর মধ্যে নাহলেও ২০ দিন মার্কেটে গিয়েছি। কিন্তু কিছুই কেনার মন হয় নি। বাড়িতে আসার পর দিন থেকে মার্কেট যাচ্ছি পছন্দমত কিনছি। মায়ের সাথে ঘরের কাজে সাহায্য করছি, একসাথে ঘর সাজাচ্ছি এটাই শান্তি।
অন্যদিকে ক্যাম্পাসের ছোট ভাই-বোনদের আবদার আর ভালোবাসার ভাগাভাগিতেই ঈদের প্রকৃত সার্থকতা খুঁজে পান গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সানজিদা ইয়াসমিন মিম। সালামির মাধ্যমে খুশির অংশীদার হওয়া নিয়ে মিম বলেন, দূরত্বের কারণে হয়তো সরাসরি হাতে সালামি দেওয়া হয় না, তবে মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে লেনদেনে ছোটদের খুশির ভাগীদার হতে বাধা থাকেনা। যখন ছোটরা মেসেজ করে ‘আপু সালামি দিবেন না?’ এমন সময় মনে হয় আমি তাদের খুশিতে অংশীদার হতে পেরেছি। মনে হয়, শুধু উপহার দিচ্ছি না, ভালোবাসা, স্নেহও ভাগাভাগি করে নিচ্ছি।
আল আমীন হোসেন অপু, পড়াশোনা করছেন দর্শন বিভাগে শেষ বর্ষে। হাজারো স্মৃতি আর বন্ধুত্বের টানে ক্যাম্পাস জীবনে কাটিয়েছেন বহু ঈদ। কিন্তু এবারের ঈদটা যেন একটু আলাদা। তিনি বলেন, এইবারের ঈদটা মনে হয় একটু আলাদা রকম লাগছে। মনটা কেমন যেন খালি খালি লাগে। ক্যাম্পাস জীবনের শেষ ঈদ ভাবলেই বুকের ভেতরটা হালকা কষ্টে ভরে যায়। আগের মতো আর বন্ধু-বান্ধবের সাথে হৈচৈ, রাতে ঘুরাঘুরি, হোস্টেলের আড্ডা—এইসব আর থাকবেনা, এইটা ভাবলেই মনটা ভারী হইয়া যায়।
কেনাকাটা, ঘরে ফেরা ও আনন্দের চেয়েও এবারের ঈদটা ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে দেখছেন শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ত্বাসিন খান। উৎসবের আমেজ ছাপিয়ে তার ভাবনায় এখন ফিলিস্তিনের হাহাকার আর আল-আকসার শূন্যতায়। বৈশ্বিক এই সংকটকালে বিলাসিতা নয় বরং আর্তমানবতার প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা ও ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়ানোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এই ঈদে যখন আমরা আনন্দ করছি, তখন আল-আকসা নীরব, ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধ বিধ্বস্ত রাস্তায় নামাজ পড়বে। পৃথিবীর একপ্রান্তে আামাদের ভাইবোনেরা অনাহারে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে সেখানে ব্যয়বহুল পোশাক ও দামী খাবারের গ মধ্য দিয়ে অন্ধ ঈদ উদযাপন করছি যা আমাদের মোটেও কাম্য নয়। আমাদের উচিত মানবিক হওয়া ও সংকটকালীন এই সময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো।
তবে পরীক্ষা,চাকরির প্রস্তুতি ও ব্যক্তিগত কারণে ঈদে বাড়ি ফেরা হচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর। প্রিয়জনহীন ক্যাম্পাসে থাকা এসব শিক্ষার্থীর একাকীত্ব ঘোচাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
জনসংযোগ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আবাসিক হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের জন্য ঈদের দুপুরে বিশেষ আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতে ক্যাম্পাসেই ঈদ উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার; যার পক্ষ থেকেও থাকছে বিশেষ ভোজের আয়োজন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









