বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। আর সেই ফুটবল যখন বিশ্বকাপের মঞ্চে গড়ায়, তখন তা শুধুমাত্র একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রূপ নেয় বিশ্বব্যাপী এক আবেগ, উন্মাদনা ও উৎসবে। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মতো রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)-এর শিক্ষার্থীদের মধ্যেও শুরু হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ, আলোচনা ও অপেক্ষা।এবারের মা ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও প্রত্যাশার কিছু কথা তুলে ধরেছেন বেরোবি প্রতিনিধি মাসফিকুল হাসান
বিশ্বকাপ সামনে রেখে ইতোমধ্যেই ক্যাম্পাসে জমে উঠেছে প্রিয় দল, খেলোয়াড় এবং সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন নিয়ে নানা আলোচনা। টং দোকান, আবাসিক হল, ক্যাম্পাসের চত্বর কিংবা বিভাগীয় করিডোর—সবখানেই এখন ফুটবল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আর ভবিষ্যদ্বাণী। কেউ আর্জেন্টিনার সমর্থক, কেউ ব্রাজিলের, আবার কেউ ইউরোপিয়ান দলগুলোর আধুনিক ফুটবল কৌশলের প্রশংসায় মুগ্ধ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্বকাপ শুধু খেলা নয়; এটি এমন একটি উপলক্ষ, যা ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও দেশের মানুষকে একই আবেগে একত্রিত করে। পড়াশোনা, পরীক্ষা ও একাডেমিক ব্যস্ততার মাঝেও এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের জীবনে আলাদা প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে আসে।
ম্যানেজমেন্ট এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান জনি বলেন, “ফুটবল বিশ্বকাপ আমার কাছে শুধু একটা টুর্নামেন্ট না, এটা একটা আবেগের নাম। আমরা ছোটবেলা থেকেই বিশ্বকাপকে ঘিরে বড় হয়েছি। বিশ্বকাপের সময় পুরো পরিবেশ বদলে যায়। ক্যাম্পাসে গেলে সবাই শুধু খেলা নিয়েই আলোচনা করে—কে ভালো খেলবে, কোন দল ফেভারিট, কার স্কোয়াড শক্তিশালী। আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক। মেসির খেলা দেখে বড় হয়েছি। তাই এবারের বিশ্বকাপ আমার কাছে অনেক বেশি আবেগের। বিশ্বকাপের সময় আমরা বন্ধুরা একসঙ্গে খেলা দেখি, রাত জেগে আলোচনা করি, আবার সকালে ক্লাসে গিয়েও ম্যাচ বিশ্লেষণ চলে। এই স্মৃতিগুলোই পরে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অংশ হয়ে থাকবে।”
দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া আরফিন শান্তা বলেন, “আগে একটা ধারণা ছিল ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে ছেলেরাই বেশি আগ্রহী থাকে। কিন্তু এখন মেয়েদের মধ্যেও বিশ্বকাপ নিয়ে দারুণ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আমরা বন্ধুরা মিলে খেলা দেখি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট শেয়ার করি, এমনকি কে চ্যাম্পিয়ন হবে সেটা নিয়েও নিজেদের মধ্যে বাজি ধরি। আমার কাছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভালো দিক হলো এটি মানুষকে একত্রিত করে। পুরো পৃথিবীর মানুষ একই সময়ে একই খেলা নিয়ে ভাবছে, আনন্দ করছে—এটা সত্যিই অসাধারণ অনুভূতি। তবে আমি মনে করি, সমর্থন যেন কখনো উগ্রতায় রূপ না নেয়। খেলাকে খেলাভাবেই উপভোগ করা উচিত।”
একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ দিপু বলেন, “বিশ্বকাপের সময় ক্যাম্পাসের পরিবেশ একেবারে বদলে যায়। রাত জেগে খেলা দেখার পরও সকালে সবাই ক্লাসে আসে শুধু ম্যাচ নিয়ে আলোচনা করার জন্য। কে গোল মিস করল, কোন কোচের কৌশল ভুল ছিল, কোন খেলোয়াড় ভালো খেলল—এসব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হয়। আমি ব্রাজিলের সমর্থক। ব্রাজিলের ফুটবলের মধ্যে যে আনন্দ আর সৌন্দর্য আছে, সেটা অন্য কোনো দলে পাই না। তবে বিশ্বকাপের সময় একটা বিষয় খারাপ লাগে—অনেক সময় সমর্থনের কারণে বন্ধুদের মধ্যেও ঝগড়া বা বিভেদ তৈরি হয়। আমি মনে করি, খেলাধুলা মানুষকে এক করার জন্য, বিভক্ত করার জন্য নয়।”
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী পঙ্কজ রায় বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পড়াশোনা, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা—সবকিছুর চাপের মধ্যে বিশ্বকাপ যেন একটু স্বস্তির জায়গা তৈরি করে দেয়। বিশেষ করে হল জীবনে সবাই মিলে খেলা দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই অন্যরকম। কেউ চিৎকার করছে, কেউ প্রার্থনা করছে, কেউ আবার গোল হলে পুরো হল মাতিয়ে তুলছে। এই মুহূর্তগুলো খুব স্পেশাল। আমি ব্যক্তিগতভাবে ফুটবলকে খুব ইতিবাচক একটা বিষয় মনে করি, কারণ এটি মানুষের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে দেয়। বিশ্বকাপের সময় পুরো ক্যাম্পাসে যে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়, সেটি সত্যিই উপভোগ করার মতো।”
পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফ বলেন, “ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বিশ্বকাপের সময় পুরো বিশ্বের নজর একটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকে। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, সমর্থকদের আবেগ, খেলোয়াড়দের গল্প—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি বৈশ্বিক আয়োজন। আমি চাই, আমাদের দেশের তরুণদের মধ্যেও ফুটবল নিয়ে আরও ইতিবাচক চর্চা বাড়ুক। বিশ্বকাপ এলেই আমরা বিদেশি দল নিয়ে উন্মাদনায় মেতে উঠি, কিন্তু একই সঙ্গে দেশের ফুটবল উন্নয়ন নিয়েও ভাবা উচিত। তরুণদের এই আগ্রহকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের ফুটবলও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে।”
শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, বিশ্বকাপ এলেই ক্যাম্পাসে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। বিভিন্ন আবাসিক হলে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন, প্রিয় দলের পতাকা টানানো, জার্সি পরে ঘোরাঘুরি—সব মিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাস যেন রঙিন হয়ে ওঠে। তবে তারা চান, সমর্থনের নামে যেন কোনো ধরনের সহিংসতা, বিদ্বেষ বা বিভেদ সৃষ্টি না হয়।
খেলাধুলার মূল উদ্দেশ্যই হলো আনন্দ, সৌহার্দ্য ও ঐক্য তৈরি করা। ফুটবল বিশ্বকাপ সেই সুযোগটিই করে দেয়, যেখানে ভিন্ন মত ও পছন্দের মানুষও একসঙ্গে বসে আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে বেরোবি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন থেকেই তৈরি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ ও উচ্ছ্বাস। খেলার এই বিশ্বমঞ্চ শুধুমাত্র বিনোদনের নয়, বরং বন্ধুত্ব, আবেগ ও বৈশ্বিক সংযোগেরও এক অনন্য প্রতীক—এমনটাই মনে করছেন তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









