লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে পুড়ছে কয়লা, জ্বলছে লোহা, ভাঁতির ফুসফাস আর ঠুকঠাক, টুং টাং শব্দে মুখরিত কামারপাড়া। নিমিষেই তৈরি করছে চাপাতি, দা, বটি, কাটারি, ছুরিসহ কুরবানির পশু কাটার লৌহজাত নানাবিধ সরঞ্জাম। দোকানের জ্বলন্ত আগুনের তাপে কামারদের ঘাম ঝরছে। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। তবুও ফুসরত নেই, সকাল পেরিয়ে রাত পর্যন্ত চালাতে হবে হাতুড়ি।
ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে ততই কামারদের ব্যস্ততা বেড়েই চলেছে। এই ঈদটির জন্য তারা সারা বছরের অপেক্ষা তাদের। আর কামারের হাতুড়ি আর হাপরের আওয়াজই জানান দিচ্ছে ঈদ এসে গেছে, আর বেশি দেরি নেই।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিনই ভিড় বাড়ছে বিভিন্ন কর্মশালায়। অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকেও আসছেন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরি ও শান দিতে।
রামগঞ্জ উপজেলার পাটবাজার,সোনাপুর বাজার, টিউরি বাজার, ভাটরা বাজার, দলটা বাজার, লক্ষ্মীধর পাড়া বাজার, কামারহাট, সমিতির বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে গৌতম কর্মকার, সঞ্জয় কর্মকার, পলাশ কর্মকার, রমেশ কর্মকার, জসিম কর্মকারসহ বেশ কয়েকজনের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, কামার শিল্পের অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানি কয়লার দাম অত্যন্ত বেড়ে গেছে। লোহার দামও অনেক বাড়তি। লোহা ও কয়লার দাম বাড়লেও সে তুলনায় কামারদের উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়েনি। কয়লার সংকটের কারণে ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না। বিভিন্ন হোটেল থেকে প্রতি বস্তা কয়লা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় কিনতে হয়। কাজের অবস্থা খুবই খারাপ। যেখানে আগে প্রতিদিন ১০০টির মত কাস্তে তৈরি হতো এখন ১০ হতে ১৫টিতে দাঁড়িয়েছে।
তারা জানান, কামারের কাজ করে এখন সংসার চালানো বড় কঠিন। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়াসহ সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কষ্টের মাঝেই দিন পার করতে হচ্ছে। বাপ-দাদার পেশা হিসেবে শিল্প টিকে টিকিয়ে রাখলেও কামার শিল্পের সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেনি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে অচিরেই এ শিল্প বিলীন হয়ে যাবে।
তারা আরো জানান, ঈদুল আযহার আগে প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকেই মানুষ দা, বটি, ছুরি, চাপাতি আর কাচি শান দিতে কিংবা নতুন করে বানাতে আসে। কেউ পুরোনো জিনিসে ধার লাগায়, আবার কেউ নতুন কিনে নেয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। তারপরও ক্রেতাদের সুবিধার কথা ভেবে তুলনামূলক কম লাভেই বিক্রি করছি। এই মৌসুমে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। তবে শ্রমের তুলনায় আয় খুব বেশি নয়।
রামগঞ্জের বয়োবৃদ্ধ কামার স্বপন কুমার বলেন, “আমাদের বেচাকেনা এখনো শুরু হয়নি। মূলত গরু বিক্রি করার ওপরই নির্ভর করে আমাদের বেচাকিনা। গরু কেনা যখন জমে ওঠে তখনই মানুষ ছোরা চাপাতি এবং আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র কিনতে ভিড় জমায়। অনেকে আবার পুরাতন ছোরা শান দিতে আনেন। আর জবাই করার ছোরা সাধারণত হুজুররাই কেনেন বেশি। এবার সবকিছুর দাম বেশি তাই দা ছোরা চাপাতির দামও একটু বেশি।”
সাধারণত গরু জবাইয়ের ছোরা প্রতি পিস বিক্রি করা হয় ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। গাড়ির স্প্রিংয়ের লোহার তৈরি চাপাতি বিক্রি হচ্ছে ১০০০ হতে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া বটি বিক্রি করা হচ্ছে ৬০০ টাকা হতে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। চাইনিজ চাপাতি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ হতে ১২’শ টাকা পর্যন্ত। ছোট দা বিক্রি হচ্ছে ৪০০ হতে ৬০০ টাকা পর্যন্ত এবং বড়দা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ হতে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়াও গরুর চামড়া ছড়ানোর জন্য ছোট ছোরাবিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা হতে ৪০০ টাকা পর্যন্ত।
কর্মশালায় আসা ক্রেতা মো. আরমান, জাহাঙ্গীর, মানিক, মিজানসহ অনেক বলেন, সামনে কোরবানির ঈদ, তাই বাসার সব ছুরি, বটি আর কাচি শান দিতে এনেছি। সারা বছর ব্যস্ততার কারণে সময় হয় না। প্রতিবছর ঈদের আগে এগুলো প্রস্তুত করে রাখি।
এ ব্যাপারে রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী আতিকুর রহমান বলেন, কামার শিল্প অতি প্রাচীন শিল্প। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এ শিল্প বাংলার ঐতিহ্য। আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব এ শিল্প কিভাবে টিকিয়ে রাখা যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









