পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে জমে উঠেছে রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে কোরবানির হাট। উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও রাজশাহী মহানগরীর ঐতিহ্যবাহী সিটি হাটসহ বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামীণ পশুর বাজারে এখন ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়।
জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খামারি ও ব্যাপারিরা গরু, ছাগল ও ভেড়া নিয়ে আসছেন হাটে। তবে এবারের বাজারে বড় গরুর তুলনায় ছোট ও মাঝারি আকারের গরু-ছাগলের চাহিদা বেশি রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের ক্রেতারা সাধ্য অনুযায়ী পশু কিনতে ঝুঁকছেন মাঝারি সাইজের গরুর দিকে।
রাজশাহীর সিটি হাট ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে বেচাকেনা। হাটজুড়ে বিক্রেতাদের হাঁকডাক, দরদাম আর ক্রেতাদের ভিড়ে মুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে থাকা গরুগুলোর সামনে ভিড় বেশি। একইভাবে ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার ছাগলেরও ভালো চাহিদা রয়েছে। হাট ঘুরে দেখা গেছে, দুইমণের বেশি ওজনের গরু বিক্রি হচ্ছে ৮৫ হাজার ৯৫ হাজার টাকা। ৩ মন থেকে সাড়ে ৩ মন ১ লাখ ৪০ থেকে ১ লাখ ৪৫ হাজার। ৫ থেকে সাড়ে ৫ মন ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ১০ থেকে ১২ মন ওজনের গরু ৫ লাখ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকায় ক্রয়-বিক্রয় চলছে।
হাটে আসা ক্রেতারা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এবার বড় গরু কেনা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও বাজেট বিবেচনায় ছোট ও মাঝারি গরুই বেশি পছন্দ করছেন তারা।
নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মান্নান একটি মাঝারি গরু কিনতে এসে বলেন, “আগে বড় গরু কেনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যেই ভালো গরু খুঁজছি। মাঝারি গরু এখন সাধারণ মানুষের জন্য বেশি উপযোগী।”
আরেক ক্রেতা শামীম পাটোয়ারী বলেন, “বড় গরুর দাম অনেক বেশি। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য মাঝারি গরুই ভরসা। এবার হাটে দেশি গরুর সংখ্যাও ভালো দেখা যাচ্ছে।”
এদিকে খামারিরাও বলছেন, বাজারের চাহিদা বুঝেই তারা এবার ছোট ও মাঝারি আকারের গরু বেশি প্রস্তুত করেছেন। কারণ বড় গরুর তুলনায় এসব গরু দ্রুত বিক্রি হচ্ছে।
নাটোর থেকে রাজশাহীর সিটি হাটে গরু নিয়ে আসা খামারি আলী হোসেন বলেন, “আমরা প্রতিবছরই কোরবানি উপলক্ষে এই হাটে গরু নিয়ে আসি। এবারও আমাদের কাছে বিভিন্ন ধরণের গরু রয়েছে। ক্রেতার সাধ্যনুযায়ী তারা গরু পাবে আমাদের কাছে।”
আরেক খামারি সাজ্জাদ আলী বলেন, “রাজশাহীর বাজারে কী ধরনের গরুর চাহিদা বেশি, সেটা বুঝেই এবার মাঝারি গরু এনেছি। বড় গরু বিক্রি করতে সময় লাগছে, কিন্তু ছোট ও মাঝারি গরু দ্রুত বিক্রি হচ্ছে।”
স্থানীয় খামারি আব্দুল খালেক বলেন, “খাদ্য ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। তারপরও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা মাথায় রেখে আমরা মাঝারি গরুই বেশি পালন করেছি। ৩ থেকে ৫ মণ ওজনের গরুর চাহিদা এবার সবচেয়ে বেশি।”
এদিকে ছাগলের বাজারেও বেশ সরগরম অবস্থা দেখা গেছে। ছোট পরিবারের ক্রেতারা ছাগলের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। হাটে ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে ভালো মানের ছাগল বিক্রি হতে দেখা গেছে।
বিক্রেতারা বলছেন, ঈদের যত সময় ঘনিয়ে আসবে, ছাগলের দাম আরও বাড়তে পারে।
গত বৃহস্পতিবার রাজশাহীর নওহাটা হাট ঘুরে দেখা গেছে, ১২ থেকে ১৪ কেজি ওজনের ছাগল বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকায়, ১৫ থেকে ১৮ কেজি ওজনের ছাগল বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকায়। ২০ কেজি ওজনের বেশি ছাগলগুলো বিক্রি হচ্ছে ২৫ হাজার টাকায়।
অন্যদিকে রাজশাহীতে কোরবানির পশুর পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রাণীসম্পদ অফিস। তাদের হিসেব অনুযায়ী, জেলায় এবার মোট কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১১টি, যেখানে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৮টি। সে হিসেবে চাহিদার তুলনায় প্রায় ৯১ হাজার ৯৫৩টি পশু বেশি রয়েছে। এতে কোরবানির পশুর সরবরাহ নিয়ে কোনো সংকট থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, রাজশাহী বিভাগে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৮৪১টি গরু, ৩ হাজার ৪২৫টি মহিষ, ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৩৯টি ছাগল এবং ৪৩ হাজার ৪০৬টি ভেড়া। সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ছাগল, যা মোট প্রাপ্য পশুর বড় একটি অংশজুড়ে আছে। এরপর রয়েছে গরু, ভেড়া ও মহিষ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজশাহী ঢাকার মতো বড় বাণিজ্যিক শহর না হওয়ায় এখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ফলে ছোট ও মাঝারি আকারের পশুর চাহিদাই বরাবর বেশি থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
হাট ইজারাদারদের দাবি, এবার পশুর সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। জেলার খামারগুলোতে দেশি গরুর উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাইরের জেলার ওপর নির্ভরতা কমেছে। তবে শেষ মুহূর্তে বেচাকেনা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
রাজশাহী সিটি হাটের ইজারাদার শওকত আলী বলেন, “এখনো অনেকে শুধু বাজার ঘুরে দেখছেন। তবে ঈদের দুই-তিন দিন আগে সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হবে। এখন পর্যন্ত সরবরাহ ভালো আছে এবং ক্রেতারাও পছন্দমতো গরু পাচ্ছেন।”
এদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিতে হাটগুলোতে পুলিশ ও প্রশাসনের তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে। জাল টাকা শনাক্তকরণ, চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধ ও যানজট নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাজ করতে দেখা গেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









