কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় পশু মোটাতাজাকরণ আর বিক্রির প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল খামারিদের। কিন্তু সেই ব্যস্ততার জায়গা দখল করে নিয়েছে উদ্বেগ। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গবাদিপশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে লাম্পি স্কিন রোগ। কোথাও আক্রান্ত হচ্ছে একের পর এক গরু, কোথাও আবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাচ্ছে বাছুর। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক ও খামারিরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলার টোক, বারিষাব, সিংহশী ও রায়েদ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক সপ্তাহ ধরে হঠাৎ করেই রোগটির সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। আক্রান্ত গরুর শরীরে প্রথমে জ্বর আসে, এরপর চামড়াজুড়ে ছোট-বড় গুটি দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে গুটিগুলো ফুলে গিয়ে ক্ষতের সৃষ্টি করছে। কোনো কোনো গরুর শরীরে ঘা পচে যাওয়ার ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। ফলে পশুগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং তাদের খাবার গ্রহণ কমে যাচ্ছে।
টোক ইউনিয়নের বড়চালা গ্রামের কৃষক আতাউর রহমান জানান, তার সাত মাস বয়সী একটি ষাঁড় বাছুর কয়েকদিন জ্বরে ভোগে। এরপর শরীরে গুটি ওঠে। অবস্থার অবনতি হলে বাছুরটি মারা যায়।
একই গ্রামের আরেক কৃষক শামসুল হক বলেন, “পাঁচ মাস বয়সী একটি বকনা বাছুর আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার পেছনে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি বাছুরটি।”
বারিষাব ইউনিয়নের লোহাদী গ্রামের খামারি আতিকুর রহমান জানান, তার খামারের তিনটি গরু আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসা, ওষুধ ও পরিচর্যায় ইতোমধ্যে প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তারপরও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি গরুগুলো।
সিংহশী ইউনিয়নের কপালেশ্বর গ্রামের এক খামারি বলেন, “তার খামারের তিনটি গরুর শরীরে হঠাৎ গুটি ও ফোলা দেখা দেয়। দ্রুত পশু চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। গত কয়েকদিন ধরে চিকিৎসা চলছে গরু তিনটির।”
রায়েদ ইউনিয়নের কৃষক রুবেল প্রধানের ভাষ্য, “তার খামারের একটি গরু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এতে তিনি আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আতঙ্কেও রয়েছেন। অন্য গরুগুলো যাতে আক্রান্ত না হয় সেই দোয়াই করছেন তিনি।”
টোক ইউনিয়নের কেন্দুয়াব গ্রামের কৃষক আক্তার আলী বলেন, “আমাদের গ্রামে অন্তত ১০ জনের গরু আক্রান্ত হয়েছে। আমার বকনা বাছুরটাও অসুস্থ। ঈদের আগে এমন পরিস্থিতিতে সবাই চিন্তায় আছি।”
স্থানীয় খামারিরা জানান, রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় একই খামারের একাধিক গরু আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকে হিমশিম খাচ্ছেন।
স্থানীয় পশুচিকিৎসক জয়নাল আবেদীন জানান, লাম্পি স্কিন একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। সাধারণত মশা, মাছি ও রক্তচোষা পোকামাকড়ের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। আক্রান্ত গরুর জ্বর, শরীরে গুটি, ক্ষত ও ফোলা দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে জটিলতা বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, “আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখতে হবে। খামার পরিষ্কার রাখতে হবে এবং মশা-মাছি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।”
কাপাসিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এ কে এম আতিকুর রহমান বলেন, “উপজেলার কয়েকটি এলাকায় লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরুর খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা ও খামারিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি খামারিদের আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত প্রাণিসম্পদ দপ্তর বা নিকটস্থ পশুচিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান।”
তিনি আরও বলেন, “নিয়মিত টিকাদান, খামার পরিষ্কার রাখা এবং আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখলে রোগের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে প্রাণিসম্পদ বিভাগ কাজ করছে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









