চুনকা কুটির থেকে সেফগার্ডে কারাগারে গিয়েছিলেন। সেই সেফগার্ডেই তিনি চুনকা কুটিরে ফিরলেন। মাঝখানে চলে গেল একটি বছর। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ১২টি মামলায় জামিন পাওয়ার পর বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। আদালতের আদেশ কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে তাকে কারামুক্ত করা হয়। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের জেলার শিরিন আক্তার মুক্তির তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মুক্তির সময় তার নিযুক্ত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওয়াদ হোসেনসহ কয়েকজন আইনজীবী ও স্বজন উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘ একবছর পর কারামুক্ত হয়ে নিজবাড়ি চুনকা কুটিরে আসলেন ডাঃ সেলিনা হায়াৎ আইভী। গতকাল বুধবার দুপুর আড়াইটায় নারায়ণগঞ্জ কোর্টে বেলবন্ড জমা দেয়া হয়েছে। রাত্রি নাগাদ তা গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছেছে তাঁর আইনজীবী সূত্রে জানাগেছে।
সাবেক মেয়র ডাঃ আইভী নারায়ণগঞ্জবাসীর দোয়া চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি আগামীতে রাজনীতি করি বা না করি, নারায়ণগঞ্জের মানুষের পাশে আমি থাকবো। নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তাঁরা এই দুঃসময়ে আমাকে নৈতিকভাবে সমর্থন করেছেন। তাঁরা আমাকে ভালোবাসেন। আমি নির্বাচন করতেও পারি আবার নাও করতে পারি। কিন্তু আমার জনগণের পাশে আমি থাকবো। জনতার সেবা করতে পারাটাই আমার পরম সৌভাগ্য।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, একের পর এক আদালতপাড়া ঘিরে আলোচনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার পর অবশেষে নারায়ণগঞ্জে একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—সাবেক মেয়র ডাঃ সেলিনা হায়াৎ আইভী কবে মুক্ত হলেন। আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আপীল বিভাগের আদেশে তাঁর কারামুক্তির পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত । ১৭ মে সেই আদেশ হয়েছিল । তবে নিম্ন আদালতের কার্যক্রম ও প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতার কারণে ঈদের পরেই হয়তো তিনি নগরবাসীর মাঝে ফিরছেন।
ডাঃ আইভীর কারামুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়তেই নারায়ণগঞ্জ নগরজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। শহরের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই এখন আইভীকে ঘিরে জল্পনা-কল্পনা। কেউ বলছেন, “নগর রাজনীতির পুরনো ছন্দ ফিরবে।” আবার কেউ মনে করছেন, “আইভীর প্রত্যাবর্তন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি করবে।”
কারাগারে থাকা অবস্থায় এবং বাইরে এসে ডাঃ আইভী নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা। তিনি বলেছেন, রাজনীতি করুন বা না করুন, মানুষের পাশে থাকবেন সবসময়। তাঁর ভাষায়, “নারায়ণগঞ্জবাসী আমাকে ভালোবেসেছেন, দুঃসময়ে নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন। আমি জনগণের কাছে কৃতজ্ঞ। মানুষের সেবা করতে পারাটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।”
আইনজীবী সূত্র জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ১২টি মামলার সবগুলোতেই জামিন বহাল রয়েছে। ফলে নতুন কোনো আইনি জটিলতা সৃষ্টি না হলে মুক্তিতে কার্যত আর বড় বাধা নেই। এখন অপেক্ষা কেবল আদালতের আনুষ্ঠানিক আদেশ এবং কারা কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার।
এই খবরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে নগরীর দেওভোগ এলাকার ঐতিহ্যবাহী ‘চুনকা কুটির’। দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটি যেন নীরবতায় ঢাকা পড়ে আছে বলে মন্তব্য এলাকাবাসীর। স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, “বাড়িটায় আবার আলো জ্বলবে, মানুষের আনাগোনা বাড়বে—এই আশাতেই আছি।”
দেওভোগ এলাকার কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা জানান, আইভী শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি এই এলাকার বহু মানুষের পরিচিত মুখ। প্রতিদিন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা নাগরিক সমস্যায় সরব উপস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর একটি আলাদা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে সেই শূন্যতা মানুষ অনুভব করছে।
নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ইতোমধ্যে তাঁর সম্ভাব্য মুক্তিকে কেন্দ্র করে নীরব প্রস্তুতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। কয়েকজন সমর্থক জানিয়েছেন, মুক্তির পর তাঁকে স্বাগত জানাতে ব্যানার, ফেস্টুন কিংবা ছোটখাটো জমায়েতের পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও প্রকাশ্যে এখনো কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অনুসারীদের একাংশ মনে করছেন, আদালতের জামিন পাওয়া মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এ কারণে তারা এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগরীর একজন সাবেক কাউন্সিলর বলেন, “আইভী আপা এখনো নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বড় একটি নাম। তাঁর জনপ্রিয়তা অনেকের জন্য অস্বস্তির কারণ। তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, ডাঃ আইভীর সম্ভাব্য মুক্তি কেবল একজন সাবেক মেয়রের কারামুক্তি নয়; এটি নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকার পর তিনি কীভাবে নিজেকে পুনরায় সক্রিয় করবেন, সেটি এখন রাজনৈতিক মহলের অন্যতম আলোচনার বিষয়।
বিশেষ করে নগর রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অভ্যন্তরীণ বিভাজন, দলীয় মেরুকরণ এবং নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার মধ্যে তাঁর অবস্থান কী হবে—তা নিয়েও চলছে নানা হিসাব। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, তিনি মুক্ত হওয়ার পর তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের একটি অংশ বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখছেন। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নাগরিক আন্দোলন, পরিচ্ছন্ন নগর গঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তাঁর মুক্তি নিয়ে সহানুভূতিশীল মনোভাব রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









