একখানা হাত আর ও ভাঙা দু'টি পা নিয়ে দীর্ঘদিন ঝিনাইদহ শহরে রিকশা চালাচ্ছেন আজাদ মোল্যা নামের এক ব্যক্তি। শারিরীক এতসব প্রতিবন্ধিতা নিয়েও তিনি নিজেকে প্রতিবন্ধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে নারাজ। তাই সন্তানদের মুখের দিকে চেয়ে তিনি নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন কঠিন সময়ে। তবু তার মনে কোন কষ্ট নেই।
রিকশা চালক সদাহাস্য আজাদ মোল্যা মেজো মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন আর ছোট মেয়েটি এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেবে। তার একান্ত ইচ্ছে মেয়েটি সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে ভালো কিছু করবে নিজের ও সমাজের জন্য। দুপুরের তপ্ত রোদে ঝিনাইদহ শহরের পুরাতন ডিসি কোর্ট এলাকায় কথা হলো আজাদ মোল্যার সাথে।
আলাপকালে জানান, তার তারুণ্যের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। তখন তার বয়স ১৭ বছর হবে। কুষ্টিয়ার খোকসা বাজারে একটি ধানকলে শ্রমিকের কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত তার বাঁ হাতটি চলে যায় হলারের মধ্যে আর সাথেসাথেই তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে দেখেন কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের বেডে। কয়েক সপ্তাহ পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও হাতটি আর ফেরত পাননি। একমাত্র ডান হাতটি ভরসা করে তিনি শুরু করেন প্যাডেলচালিত রিকশা। শৈলকুপা থেকে গাড়াগঞ্জ ৬ কিলোমিটার রাস্তা বা স্থানীয় এলাকায় তিনি ছুটতে শুরু করেন। নানা জনে নানা কথা বললেও দমে যাননি তিনি। যাত্রীদের কেউ কেউ তার বাম হাতটি নেই বুঝতে পেরে অনেক সময় এড়িয়ে গেলে কষ্ট পেলেও তা মনের মধ্যে পুষে রাখেন না ষাটোর্দ্ধ আজাদ মোল্যা। তিনি জানান, পরক্ষণেই আরেকটা ভাড়া জুটে যায় অবলীলায়।
আজাদ মোল্যা জানালেন, রিকশা চালানোর সময় এক দুর্ঘটনায় তার বাম পা ভেঙে যায়। দু'য়েক বছর পর প্রকৃতির নির্মম পরিহাসে এক মোটরবাইকার তাকে আঘাত করলে ডান পায়েও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন তিনি কোন পায়েই তেমন একটা শক্তি পাননা। ইতোমধ্যে বড় ও মেজো মেয়েটি বিয়ে দেন। ৪-৫'শ টাকা যা পান, তা দিয়েই ঠিকমত জুটে যায় “নুনভাত”। কলেজপড়ুয়া ছোট মেয়েটিও লেখাপড়ার পাশাপাশি সুযোগ পেলেই মাকে সাহায্য ও সংসারের কাজে আর বড় বোনের সন্তানদের দেখভাল করে।
প্রতিবন্ধীতার শিকার মানুষদের উদ্দশ্যে আজাদ মোল্যার কথা- সংসার বা সমাজের অন্য মানুষের ওপর ভর করে চলার মধ্যে বাহাদুরি নেই, একারণে পরিবারের সদস্যদের কাছে যেমন ভালবাসা পাওয়া যায়না, সমাজের মানুষও দয়ার চোখে দেখে। তিনি মনে করেন সমস্যা যতই প্রকট হোক, নিজেকে চালিয়ে নেয়ার মত মন মানসিকতা থাকলে সমাজের আর দশজনের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও মানুষকে কারো করুণার পাত্র হতে হয়না। তবে সমাজের মানুষের সাহায্যের বদলে সহযোগিতা পাবার মত মানসিকতা গড়ে তুলতে হয় একজন শারিরীক প্রতিবন্ধীতার শিকার ব্যক্তিকে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









