রাষ্ট্র পরিচালনায় আশাবাদ প্রয়োজন, কিন্তু অর্থনীতি পরিচালনায় প্রয়োজন বাস্তবতা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। দেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং অবকাঠামো খাতে সরকারের বড় পরিকল্পনার প্রতিফলন এতে রয়েছে। কিন্তু যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, সেটিই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে।
বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধারাবাহিকভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আগের বছরেও ঘাটতি ছিল প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা। তারও আগে লক্ষ্যমাত্রা ও আদায়ের মধ্যে বড় ব্যবধান ছিল। অর্থাৎ সমস্যাটি সাময়িক নয়; এটি কাঠামোগত। এমন বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরে এনবিআরের জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অর্জনের জন্য প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। অথচ দেশের রাজস্ব প্রশাসন অতীতে কখনোই এমন প্রবৃদ্ধির ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি।
প্রশ্ন হলো, এই অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে কোথা থেকে? করদাতাদের পরিচিত একটি অভিযোগ হলো—করের আওতা বাড়ানোর পরিবর্তে সরকার বারবার একই শ্রেণির করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ায়। যারা নিয়মিত কর দেন, তারাই নতুন নতুন কর ও শুল্কের ভার বহন করেন; অন্যদিকে অর্থনীতির বড় একটি অংশ কার্যত করের বাইরে থেকে যায়। কর ফাঁকি, আন্ডার-ইনভয়েসিং, অবৈধ অর্থপ্রবাহ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে রাষ্ট্র প্রতি বছর বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বছরে দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি কর ফাঁকি হয়। যদি এই অর্থের সামান্য অংশও উদ্ধার করা যেত, তাহলে আজ রাজস্ব ঘাটতি এত ভয়াবহ রূপ নিত না।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের বাজেট আলোচনায় প্রায়ই লক্ষ্যমাত্রার জৌলুস থাকে, কিন্তু সংস্কারের অঙ্গীকার থাকে কম। প্রতি বছর রাজস্ব বৃদ্ধির বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, তথ্যভিত্তিক নজরদারি এবং করজাল সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায় না। ফলে বাজেটের সংখ্যা বাড়লেও রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়ে না।
এবারের বাজেটের আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে বিপুল পরিমাণ দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। ঋণ কখনোই নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন ঋণনির্ভরতা স্থায়ী চরিত্র ধারণ করে। কারণ ঋণের অর্থ দিয়ে আজকের ব্যয় মেটানো গেলেও ভবিষ্যতে তার সুদ ও আসল পরিশোধের দায় জাতিকেই বহন করতে হয়।
এমনিতেই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, তার ওপর নতুন ঋণের বোঝা অর্থনীতিকে আরও সংকুচিত করতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন ব্যয়ই প্রথম আঘাতের শিকার হয়। অনেক প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীর হয়ে যায়, কিছু প্রকল্প স্থগিত হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক খাতের ব্যয়ও সংকুচিত করতে হয়। ফলে কাগজে বড় বাজেট থাকলেও বাস্তবে তার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায় না।
এ কারণেই আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন কর আরোপ নয়, বরং কর ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন। কর ফাঁকির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা, করজাল সম্প্রসারণ, সম্পদের তথ্যভান্ডার সমন্বয়, অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হতে পারে রাজস্ব বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর পথ। একই সঙ্গে ব্যয়ের ক্ষেত্রেও কঠোর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ রাজস্ব সংস্কার ছাড়া ঘাটতি কমবে না, আর ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ঋণনির্ভরতা কমবে না।
একটি বাজেটের সাফল্য তার আকারে নয়, বাস্তবায়নে। ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে, আবার অবাস্তব প্রত্যাশার বোঝাও হয়ে উঠতে পারে। সেই ফলাফল নির্ভর করবে সরকার কতটা আন্তরিকভাবে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার করতে পারে এবং অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে তার ওপর। সংখ্যার জাদু দিয়ে কিছু সময়ের জন্য বাস্তবতাকে আড়াল করা যায়, কিন্তু অর্থনীতির নির্মম সত্যকে বদলানো যায় না। ঘাটতির পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে তাই আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উচ্চাভিলাষ নয়, বাস্তববাদী সংস্কার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









