খামারের মূল ফটকে পৌঁছাতেই থামতে হয়। ভেতরে ঢোকার আগে হাত-পা ধোয়া বাধ্যতামূলক, বদলাতে হয় জুতা। প্রবেশপথে রাখা জীবাণুনাশক পানিতে পা ডুবিয়ে তবেই মিলবে অনুমতি। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এটি কোনো হাসপাতালের সংবেদনশীল ইউনিট কিংবা গবেষণাগারের জীবাণুমুক্ত কক্ষ। কিন্তু না, এটি একটি ব্রয়লার মুরগির খামার।
আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, খামারজুড়ে নেই কোনো দুর্গন্ধ, নেই অপরিচ্ছন্নতার চিহ্ন। পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে বেড়ে উঠছে হাজার হাজার ব্রয়লার মুরগি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এসব মুরগি উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে না কোনো অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক।
বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের কর্ণকাঠি গ্রামে গড়ে উঠেছে এমনই এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, যা এখন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৩ সালে বরিশাল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতাধীন আঞ্চলিক প্রাণিরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের কারিগরি সহায়তা ও তত্ত্বাবধানে কর্ণকাঠি গ্রামে যাত্রা শুরু করে ‘মডেল পোলট্রি ভিলেজ’ প্রকল্প।
প্রথমে মাত্র ১০ জন খামারিকে নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ একটি সফল মডেলে পরিণত হয়েছে। শুধু কর্ণকাঠিই নয়, আশপাশের এলাকার খামারিরাও এখন আগ্রহ নিয়ে এই পদ্ধতি অনুসরণ করছেন।
যেখানে দেশের অধিকাংশ ব্রয়লার খামারে রোগ প্রতিরোধ কিংবা দ্রুত ওজন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে, সেখানে কর্ণকাঠির খামারিরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ বেছে নিয়েছেন। তারা বিশ্বাস করছেন পরিচ্ছন্নতা, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বায়োসিকিউরিটিতেই।
কর্ণকাঠির খামারগুলোতে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। বাইরের লোকজনের অবাধ যাতায়াত নেই। প্রবেশের আগে জীবাণুমুক্তকরণ, নির্দিষ্ট জুতা ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ বাধ্যতামূলক।
খামারের প্রতিটি শেড নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা হয়। খাবার ও পানির মান নিশ্চিত করা হয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। ফলে রোগজীবাণুর বিস্তার কমে আসে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
প্রকল্পের আওতায় খামারিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে পোলট্রি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ, খামার পরিচ্ছন্নতা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার বিষয়ে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বায়োসিকিউরিটি নির্দেশনা বাস্তবায়নে।
এর সুফলও মিলেছে হাতেনাতে। কমেছে রোগের প্রকোপ, মুরগির মৃত্যুহার। উৎপাদন খরচ কমে যাওয়ায় বেড়েছে খামারিদের মুনাফাও।
আঞ্চলিক প্রাণিরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘‘অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক ব্যবহার বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে নই। প্রয়োজন হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় ও নিয়মবহির্ভূত ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আগে অনেক খামারি মুরগি খামারে তোলার পরপরই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতেন। এতে সাময়িকভাবে কিছু সুবিধা মিললেও দীর্ঘমেয়াদে তৈরি হতো ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু।’’
তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় এক কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।
কর্ণকাঠি গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা শাওন সরদারের খামার যেন এই উদ্যোগের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। ছোট পরিসরে শুরু করা তার খামারে বর্তমানে তিনটি শেডে প্রায় তিন হাজার ব্রয়লার মুরগি রয়েছে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে মুরগিগুলো।
শাওন বলেন, ‘‘শুরুতে আমরা কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম। অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া মুরগি পালন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু এখন ফলাফল দেখে আমরা আশাবাদী। রোগ কমেছে, মৃত্যুহার কমেছে, খরচও কমেছে।’’
তিনি জানান, নিরাপদ উপায়ে উৎপাদিত মুরগির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। ক্রেতারাও এখন সচেতন হচ্ছেন।
খামারিদের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্ণকাঠিতে উৎপাদিত অ্যান্টিবায়োটিকবিহীন মুরগির মাংসের স্বাদ ও গুণগত মান ভালো হওয়ায় বাজারে এর আলাদা চাহিদা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে শুধু বরিশালের বাজারেই নয়, এখানকার উৎপাদিত মুরগি ও মাংস দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি চট্টগ্রামেও পাঠানো হচ্ছে এই নিরাপদ পণ্য।
আঞ্চলিক প্রাণিরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের তথ্য বলছে, প্রকল্প শুরুর আগে সংগৃহীত নমুনাগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর উপস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে ছিল।
তবে প্রশিক্ষণ, নিয়মিত তদারকি এবং বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পর পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাচের নমুনা বিশ্লেষণে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কমার ইতিবাচক প্রবণতা পাওয়া গেছে।
আঞ্চলিক প্রাণিরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক মো. নূরুল আলম বলেন, ‘‘কর্ণকাঠির অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে সঠিক ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করা গেলে অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই নিরাপদ ও মানসম্মত ব্রয়লার উৎপাদন সম্ভব।’’
তিনি বলেন, ‘‘এটি কেবল একটি প্রকল্প নয়; এটি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং টেকসই পোলট্রি শিল্প গড়ে তোলার একটি কার্যকর মডেল। দেশের অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা গেলে পোলট্রি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের নতুন অধ্যায় সূচিত হবে।’’
কর্ণকাঠির এই গল্প শুধু কয়েকজন খামারির সাফল্যের গল্প নয়। এটি সচেতনতা, বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ।
যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় উদ্বিগ্ন, সেখানে বরিশালের একটি ছোট্ট গ্রামের খামারিরা দেখিয়ে দিচ্ছেন বিকল্প পথ। পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও সচেতনতাকেই তারা বানিয়েছেন রোগ প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার।
নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের এই নীরব বিপ্লব হয়তো ভবিষ্যতে দেশের পোলট্রি শিল্পের জন্য নতুন এক মানদণ্ড তৈরি করবে, যেখানে লাভের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব পাবে মানুষের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









