বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তোলা, মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত হয়েছিল রাজশাহীর নভোথিয়েটার। দেশের অন্যতম বৃহৎ ও আধুনিক এই বিজ্ঞানভিত্তিক স্থাপনাটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৭১ কোটি টাকা। কিন্তু উদ্বোধনের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাশিত দর্শক টানতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। দর্শনার্থীর অভাব, জনবল সংকট এবং পর্যাপ্ত প্রচারণার ঘাটতিতে বর্তমানে অনেকটা নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের এই বৃহৎ বিজ্ঞান কেন্দ্র।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মাসিক আয় দিয়ে নিয়মিত পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ১৭ লাখ টাকা বকেয়া জমেছে। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, বকেয়া বিল পরিশোধে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে রাজশাহী নগরীর কেন্দ্রীয় উদ্যানের সামনে অত্যাধুনিক নভোথিয়েটার নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৩২ কোটি টাকা। পরে জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হয়ে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৭১ কোটি টাকা।
বিশাল আয়তনের এই কমপ্লেক্সে রয়েছে ২০০ আসনের মাল্টিপারপাস হল, ৬০ আসনের সেমিনার ও সভাকক্ষ, আধুনিক সায়েন্টিফিক লাইব্রেরি, নভো ক্যাফেটেরিয়া, স্ন্যাকস বার, ৮৫টি গাড়ির পার্কিং সুবিধা, দেশের সর্ববৃহৎ গম্বুজাকৃতির প্ল্যানেটারিয়াম, অত্যাধুনিক ফাইভ-জি থিয়েটার, উন্নতমানের পর্যবেক্ষণ টেলিস্কোপসহ নানা বিজ্ঞানভিত্তিক প্রদর্শনী ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠানটির মূল আকর্ষণ হলো প্ল্যানেটারিয়াম, যেখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মহাকাশ, গ্রহ-নক্ষত্র, সৌরজগৎ এবং মহাবিশ্বের বিভিন্ন বিষয় দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান শিক্ষাকে আনন্দদায়ক ও বাস্তবভিত্তিক করে তুলতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই সম্ভাবনার অনেকটাই অপূর্ণ থেকে গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রদর্শনী পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় অনেক সুবিধা পুরোপুরি চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত ১৯টি পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র দুটি পদে স্থায়ী কর্মকর্তা রয়েছেন। বাকিরা বিভিন্ন দপ্তর থেকে সংযুক্তির মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছেন।
সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে অপারেটর পদে। সাতজন অপারেটরের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মাত্র দুজন দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি শো পরিচালনার পরিকল্পনা থাকলেও অধিকাংশ দিন এক বা দুইটির বেশি শো চালানো সম্ভব হয় না। অনেক সময় নির্ধারিত শোও বাতিল করতে হয়। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত প্রদর্শনী না থাকায় দর্শনার্থীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। প্রতিটি শোতে গড়ে মাত্র ১০ থেকে ১৫ জন দর্শক উপস্থিত থাকেন। অনেক দর্শনার্থী দূর-দূরান্ত থেকে এসে কাক্সিক্ষত প্ল্যানেটারিয়াম শো বা অন্যান্য প্রদর্শনী না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নভোথিয়েটার কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট আয় হয়েছে প্রায় ৪৮ লাখ টাকা, যেখানে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ আয়-ব্যয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ১৭ লাখ টাকা। তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে আয় হয়েছে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা এবং ব্যয় হয়েছে ৫৫ লাখ টাকা। তবুও আগের বকেয়া ও নিয়মিত পরিচালন ব্যয়ের কারণে আর্থিক চাপ পুরোপুরি কাটেনি। বর্তমানে বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ১৭ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। এর পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, আনসার সদস্যদের নিরাপত্তা ব্যয়, পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ, পানি ও অন্যান্য খাতে নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজশাহীর মতো বিভাগীয় শহরে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এমন একটি আধুনিক বিজ্ঞান কেন্দ্রের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। অনেকেই মনে করেন, শুরু থেকেই পর্যাপ্ত প্রচারণা ও জনসম্পৃক্ততার উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। রাজশাহী নগরীর একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক জানান, অনেক স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাই জানে না যে এখানে নিয়মিত বিজ্ঞানভিত্তিক প্রদর্শনী ও প্ল্যানেটারিয়াম শো অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষ শিক্ষা সফর, বিজ্ঞান কর্মশালা ও শিক্ষার্থী প্যাকেজ চালু করা গেলে দর্শক সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
নভোথিয়েটারের উপ-পরিচালক এবাদত হোসেন বলেন, “আমরা দর্শক বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এখানে শিক্ষার্থীদের শেখার জন্য অনেক কিছু রয়েছে। মহাকাশ, গ্রহ-নক্ষত্র এবং বিজ্ঞান বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। যদি একটি নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা পাওয়া যায়, তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আরও বেশি শিক্ষার্থী এখানে আসতে পারবে।” তিনি আরও বলেন, “গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে আমাদের আয় বেড়েছে। দর্শনার্থী সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য প্রচারণা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ১৭ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে, সেটি পরিশোধের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









