এক সময় সিলেটের গোলাপগঞ্জের প্রতিটি হাট-বাজার, অলিগলি ও প্রধান সড়কে প্যাডেল রিকশার ছিল অবাধ বিচরণ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যাত্রী নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতেন রিকশাচালকরা। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ যাত্রী—সবার কাছে প্যাডেল রিকশা ছিল নিরাপদ, সহজলভ্য ও জনপ্রিয় একটি পরিবহন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন বিলুপ্তির পথে।
বর্তমানে গোলাপগঞ্জের সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজি ও মোটরচালিত বিভিন্ন যানবাহনের আধিপত্য বেড়েছে। দ্রুতগতি ও তুলনামূলক কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হওয়ায় মানুষও এসব যানবাহনের প্রতি বেশি আগ্রহী। ফলে এক সময়ের জনপ্রিয় প্যাডেল রিকশা এখন ঠাঁই নিচ্ছে ইতিহাসের পাতায়।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা নোমান মিয়া স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘‘প্রায় দুই দশক আগেও গোলাপগঞ্জে শত শত প্যাডেল রিকশা চলাচল করতো। বাজারে জন্য কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে রিকশাই ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি ছিল আরামদায়ক যাতায়াতের মাধ্যম। রিকশার টুংটাং ধ্বনি, ধীরে চলা এবং চালকদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক ছিল সে সময়ের এক অনন্য চিত্র।’’
গোলাপগঞ্জের কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা জানান, এক সময় রিকশাস্ট্যান্ডগুলো যাত্রী ও চালকদের কোলাহলে মুখর থাকত। সকাল হলেই চালকরা রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন জীবিকার সন্ধানে। দিনের শেষে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত তাদের সংসার। কিন্তু বর্তমানে অটোরিকশার ব্যাপক বিস্তারের কারণে অনেক চালকই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
রিকশাচালক ফুহাদ মিয়া নিজের ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘‘আগে দিনে ভালো আয় করা সম্ভব হলেও এখন সেই সুযোগ নেই। অটোরিকশা দ্রুতগতির হওয়ায় যাত্রীরা সেদিকেই বেশি ঝুঁকছেন। ফলে প্যাডেল রিকশা বিক্রি করে অটোরিকশা চালানো শুরু করেছেন সবাই, আবার কেউ কেউ অন্য পেশায় চলে গেছেন।’’
পরিবেশকর্মী তামিম আহমদের মতে, ‘‘প্যাডেল রিকশা পরিবেশবান্ধব বাহন। এতে কোনো ধরনের জ্বালানি প্রয়োজন হয় না এবং পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিও থাকে না।’’ আধুনিক যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ দূষণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ঐতিহ্যবাহী এই বাহনকে সংরক্ষণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
একই সুর শোনা গেল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী আফসার আহমদ বলেন, ‘‘প্যাডেল রিকশা শুধু একটি যানবাহন নয়, এটি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহুরে জনজীবনের সঙ্গে রিকশা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এক সময়ের ব্যস্ততম এই বাহন হারিয়ে গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো কেবল বইয়ের পাতা বা পুরোনো ছবিতেই দেখতে পাবে এর অস্তিত্ব।’’
গোলাপগঞ্জের মানুষের স্মৃতিতে এখনও উজ্বল সেই দিনগুলো, রাস্তায় দেখা যেত রঙিন সাজে সজ্জিত প্যাডেল রিকশা। টুংটাং বেলের শব্দ, চালকদের হাঁকডাক এবং ধীরগতির সেই যাত্রা আজ অনেকের কাছেই নস্টালজিয়ার এক অংশ।’’
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি ও আধুনিকতা এগিয়ে গেলেও গোলাপগঞ্জের মানুষের মনে পুরনো দিনের প্যাডেল রিকশার স্মৃতি এখনও অমলিন। অটোরিকশার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এই বাহন যেন এক সময়ের গোলাপগঞ্জের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আবেগের নীরব সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









