ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা ও গৌরীপুরে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ ও আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল ১২ কোটি টাকার বৃহৎ পানি সরবরাহ প্রকল্প। নির্ধারিত ১৮ মাস পেরিয়ে প্রায় দুই বছর। কাজ হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। ইতোমধ্যে মোটা অঙ্কের বিল তুলে নিয়েছেন ঠিকাদার।
কাজের ধীর গতির জন্য সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যাদেশ বাতিলের জন্য প্রধান কার্যালয়ে চিঠি দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এদিকে, ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাউকেই খোঁজে পাওয়া যায়নি। কার্যত মোটা অঙ্কের বিল তুলে কাজ ফেলে উধাও ঠিকাদার।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী ঠিকাদার ও অধিদপ্তরের একটি অসাধু চক্রের যোগসাজশেই থমকে আছে ব্যবস্থা গ্রহণ। ফলে ময়মনসিংহের গৌরীপুর ও মুক্তাগাছা উপজেলার মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। দুই উপজেলায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের মোট ব্যয় ১২ কোটি ৬ লাখ টাকা। কাজ পায় ঢাকাভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নূর অ্যান্ড কোং।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গৌরীপুর উপজেলার পুম্বাইল গ্রামে প্রকল্প এলাকায় কার্যত কাজ বন্ধ। কোথাও শ্রমিক নেই, নেই নির্মাণকাজের কোনো তৎপরতা। গৌরীপুরে শুধু একটি ঘরের আংশিক ইটের গাঁথুনি দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়রা জানান কাজ বন্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে মুক্তাগাছার পাইকাশিমুল প্রকল্প এলাকা নির্মাণকাজ হয়েছে মেঝে পর্যায়ে। কিন্তু দপ্তরের নথিতে দেখানো হচ্ছে- কাজের অগ্রগতি ২০ শতাংশ। প্রশ্ন উঠেছে, দুই বছরেও যদি মাত্র ২০ শতাংশ কাজ হয়, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা এতদিন কী করছিলেন?
সূত্র বলছে, বাস্তব অগ্রগতি খুব কম হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের বিল উত্তোলন করেছে। কত টাকা ছাড় করা হয়েছে- সেই তথ্য গোপন রাখা হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকল্প ব্যয়ের মোটা অংশ ইতোমধ্যে ঠিকাদারের হাতে পৌঁছে গেছে। গ্রামীণ মানুষের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহের মহৎ উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্পটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবস্থাপনা, ধীরগতি, জবাবদিহির অভাব এবং প্রভাবশালী ঠিকাদারদের দৌরাত্ম্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ময়মনসিংহের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারকে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
ময়মনসিংহের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল চাচ্ছেন। কিন্তু ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাদের ভাষায়, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা চাইলে কী হবে, শেষ সিদ্ধান্ত তো প্রধান দপ্তরের।
প্রকল্পের অধীনে গৌরীপুর ও মুক্তাগাছায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য পাম্প স্থাপন ও ট্যাংক নির্মাণের কাজ শেষ হলে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে বাড়িতে বাড়িতে পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে বিশুদ্ধ পানি। ট্যাংকের পানি ধারণক্ষমতা হবে এক লাখ লিটার। প্রকল্পের আওতায় দুটি উপজেলায় ৩৫০টি করে মোট ৭০০ পরিবার পাবে বিশুদ্ধ পানি। পানির জন্য মিটার অনুযায়ী বিল পরিশোধ করবেন উপকারভোগীরা। উপকারভোগী মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করা হবে পানির জন্য মাসিক বিল। কিন্তু প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। অনেকেই প্রকল্প সম্পর্কে কিছুই জানেন না। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি তাদের জন্য প্রয়োজনীয়ও নয়।
প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রকৃত চাহিদা যাচাই করা হয়েছিল কি না, সেটিও এখন আলোচনায় এসেছে। কারণ স্থানীয়রা জানিয়েছে, এই প্রকল্পের বিষয়ে তারা তেমন কিছু জানেন না। কেউ তাদের ডেকে জানাননি। তবে লোকমুখে জেনেছেন পানি সরবরাহের জন্য পাম্প স্থাপন করা হবে। মাসে ১০০ টাকার বিনিময়ে সে পানি ব্যবহার করতে পারবে গ্রামের মানুষ।
গৌরীপুরের পুম্বাইল গ্রামের বাসিন্দা আজিজ মিয়া বলেন, ‘‘আমাদের বাড়িতে মোটর আছে। বিশুদ্ধ পানিই খাই। আবার সরকারি পানি নেওয়ার দরকার কী?’’
মুক্তাগাছার পাইকাশিমুল এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নামে মাত্র কাজ হয়। পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এলাকার মানুষও এখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
মুক্তাগাছা প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিক শফিকুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের সঙ্গে ২৬ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। কিন্তু নির্মাণসামগ্রী সময়মতো সরবরাহ না করায় কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। রড, সিমেন্টসহ প্রয়োজনীয় মালামাল ঠিকমতো না আসলে কাজ তো এগোবে না।
নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১২ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে মুক্তাগাছা ও গৌরীপুরের এই প্রকল্পের জমি কেনা হয়নি। দুটি ইউনিটেই জমি নেওয়া হয়েছে স্থানীয়দের দানের মাধ্যমে। যে কারণে জমি পেতেই অনেক সময় লাগে। এরপর প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও চলছে খুবই ধীর গতিতে। গত মার্চ মাসে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ঠিকাদার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করে। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক টুকুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কাজের ধীরগতির বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেন। বিল উত্তোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেননি। এদিকে ঠিকাদারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বিল উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল হোসেনের দায়িত্বকালে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে কাজের তদারকির বিষয়ে তার ভূমিকাও এখন প্রশ্নের মুখে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ময়মনসিংহ বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক বলেন, ‘‘ঠিকাদারকে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থাও।’’
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, সরকারি কাজ যদি এমন ধীরগতিতে হয় তাহলে সাধারণ মানুষ কিভাবে উপকৃত হবেন। দ্রুত কাজ শেষ করার আহ্বান জানান সচেতন মহল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









