সুনামগঞ্জের মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলায় অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর। বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার স্থান হিসেবে স্বীকৃত এই হাওর প্রায় ১২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং এটি জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পরিবেশগত সমস্যার কারণে হাওরটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়েছে।
একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরে ১৪০ থেকে ২০০ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে অতিরিক্ত মাছ আহরণ, অবৈধ জাল ব্যবহার এবং প্লাস্টিক দূষণের কারণে মাছের বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাওরে এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে প্লাস্টিকের তৈরি ‘কিরণমালা চাঁই’। মাছ ধরার পর অনেক জেলে এসব চাঁই হাওরেই ফেলে রেখে যান। ফলে প্লাস্টিক দীর্ঘদিন পানিতে থেকে পরিবেশের ক্ষতি করছে। সময়ের সঙ্গে এসব প্লাস্টিক ক্ষুদ্র কণায় (মাইক্রোপ্লাস্টিক) পরিণত হয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে। এতে মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যশৃঙ্খলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার (পোহাস) জানান, টাঙ্গুয়ার হাওর আগে থেকেই অবৈধ কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি এবং নির্বিচারে মাছ শিকারের কারণে চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এভাবে চলতে থাকলে অনেক দেশীয় মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সচেতন মহলের মতে, প্লাস্টিকের পরিবর্তে বাঁশ ও বেতের তৈরি পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার সরঞ্জাম ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করা এবং আইন প্রয়োগ জোরদার করা প্রয়োজন।
প্রতিবছর উজান থেকে নতুন পানির সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ টাঙ্গুয়ার হাওরে আসে। এসব মাছ ধরতে স্থানীয় জেলেরা প্লাস্টিকের চাঁই ব্যবহার করছেন। যদিও পরিবেশবিধ্বংসী এই সরঞ্জাম নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়, তবুও এর উৎপাদন, মজুত ও বিক্রি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না।
এ বছর চেরাপুঞ্জিতে অতিবৃষ্টির কারণে যাদুকাটা ও পাটলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে আগেভাগেই হাওরে প্রবেশ করেছে। এ সুযোগে অনেক জেলে প্লাস্টিকের চাঁই দিয়ে মাছ ধরায় নেমেছেন। বিশেষ করে চিংড়ি ও ছোট মাছ ধরতে এই চাঁই বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে।
হাওরপাড়ের বাসিন্দা জামিনূর ইসলাম বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চললেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ফলে হাওরের পরিবেশ দিন দিন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।’’
টাঙ্গুয়ার হাওর উন্নয়ন ফোরামের সহ-সভাপতি অখিল তালুকদার বলেন, ‘‘টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। প্লাস্টিকের চাঁই এখন হাওরের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।’’
মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সঞ্জয় ঘোষ এদিনকে বলেন, ‘‘হাওরের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্লাস্টিকের চাঁই ব্যবহার করে মাছ শিকারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









