বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এক মহোৎসব। দেশের ‘আমের বাণিজ্যিক রাজধানী’খ্যাত নওগাঁর সীমান্তবর্তী বরেন্দ্র অঞ্চল সাপাহারে এখন উৎসবের আমেজ। উপজেলার দিগন্তজোড়া বাগানে গাছে গাছে ঝুলছে পাকা ও আধাপাকা আম্রপালি, বারি-৪ কিংবা ব্যানানা ম্যাঙ্গো। দেশের অন্যতম বৃহৎ আমের মোকাম সাপাহারে সকালের প্রথম আলো ফুটতেই শুরু হয় কর্মযজ্ঞ, যা চলে রাত অবধি। শত শত ভ্যান, শ্যালোচালিত যান আর ট্রাকের দীর্ঘ সারি, ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক আর আড়তদারদের ব্যস্ততায় মুখর পুরো এলাকা। কিন্তু এই চোখধাঁধানো কর্মচাঞ্চল্যের চাকচিক্য আড়াল করতে পারছে না ভেতরের এক নির্মম ও করুণ বাস্তবতাকে।
ভেতরের খবর হলো—এই ভরা মৌসুমেও সাপাহারের আমচাষিদের মুখে কোনো হাসি নেই। এক বুক আশা নিয়ে বছরজুড়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলেও, মৌসুমের শেষে এসে চাষিদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ, চোখে কেবলই হতাশার জল।
খরচের বোঝায় পিষ্ট কৃষক, বাজারে মিলছে না ন্যায্যমূল্য
কৃষকদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। মাঠের বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর। গত এক বছরে সার, কীটনাশক, সেচ ও বাগানের পরিচর্যা খরচ বেড়েছে হু হু করে। আকাশছোঁয়া শ্রমিকের মজুরি আর পরিবহন খরচ মিটিয়ে হাটে আম এনে কৃষকরা দেখছেন অন্য চিত্র। উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বাড়লেও বাজারে মিলছে না আমের কাঙ্ক্ষিত দাম। গত বছরের তুলনায় প্রায় সব জাতের আমের দাম প্রতি মণে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে লাভ তো দূরের কথা, মূল পুঁজি বা উৎপাদন খরচ ওঠানোই এখন অলীক কল্পনা হয়ে দাঁড়িয়েছে শত শত কৃষকের জন্য।
মণের নামে ৫২ কেজির ‘নিঃশব্দ জুলুম’
হতাশার আগুনে ঘি ঢালছে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ওজনের এক অদ্ভুত নিয়ম, যা কৃষকদের কাছে এখন ‘নিঃশব্দ জুলুম’। নিয়মের ৪box (৪০ কেজি) মণের পরিবর্তে এখানে কৃষকদের আম বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৫ কেজি ওজনে!
হাটে আম বিক্রি করতে এসে ক্ষোভে ও দুঃখে ফেটে পড়েন চাষি বেলাল হোসেন। তিনি বলেন,
"গত বছর মৌসুমের শুরুতে ৪৫ কেজিতে মণ ধরা হতো। এখন ৫২ থেকে ৫৩ কেজি পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। আবার নানা অজুহাতে আরও কয়েক কেজি বেশি নেওয়া হয়। হিসাব করলে ১৩ মণ আম দিয়েও ১০ মণের দাম পাওয়া যায়। আমাদের এই লোকসান কে দেখবে?"
একই সুর শোনা গেল আমচাষি হারুনুর রশীদের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, "এখন বাগান করতে আগের তুলনায় অনেক বেশি খরচ হয়। শ্রমিক, সার, কীটনাশক—সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু আমের দাম কমেছে। তার ওপর প্রতি মণে ১২ থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত বেশি আম দিতে হচ্ছে। এভাবে কৃষকের লাভ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।"
প্রকৃতির মার আর ‘ঢলন’র মরণফাঁদ
এরই মধ্যে নতুন সংকট তৈরি করেছে প্রকৃতি। তীব্র ভ্যাপসা গরমে সব বাগানের আম একসঙ্গে পেকে যেতে বসেছে। এলাকায় কোনো হিমাগার বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় চাষিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। আম ধরে রাখার কোনো উপায় নেই, পচন ধরার ভয়ে দ্রুত বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। আর এই সুযোগটাই নিচ্ছেন আড়তদাররা।
আরেক ভুক্তভোগী চাষি মিলন বলেন, "এ বছর গরমে সব আম একসঙ্গে পেকে গেছে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে আড়তদাররা যে দাম বলছেন, বাধ্য হয়ে সেই দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন আমাদের মতো সাধারণ কৃষকরাই।"
কৃষকদের স্পষ্ট দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই 'ঢলন' পদ্ধতি আসলে তাদের পকেট কাটার এক হাতিয়ার। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও এখনো মেলেনি কোনো কার্যকর সমাধান।
ব্যবসায়ীদের যুক্তি ও প্রশাসনের আশ্বাস
অবশ্য এই পুরো সংকটকে ভিন্ন চোখে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। সাপাহার আম ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাত জানান,
"রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন মোকামে ৫৪ থেকে ৫৬ কেজি হিসেবে আম কেনাবেচা হয়। সাপাহারে ক্যারেটসহ প্রায় ৫০ কেজি হিসেবে আম কেনা হচ্ছে। কোথাও কোনো সুনির্দিষ্ট অনিয়ম হলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।"
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃষকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সাপাহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোমানা রিয়াজ বলেন,
"আমরা নিয়মিত বাজার তদারকি করছি। কৃষকদের কাছ থেকে লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ পেলেই দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।"
হুমকির মুখে উত্তরের আম-অর্থনীতি?
চলতি মৌসুমে শুধু সাপাহারেই প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যেখান থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কৃষি সংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা—উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যদি আমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না যায়, ওজনের এই ‘ঢলন’ পদ্ধতিতে যদি স্বচ্ছতা না আসে এবং জরুরি ভিত্তিতে হিমাগার সুবিধা তৈরি না হয়, তবে আমচাষে কৃষকদের আগ্রহ চিরতরে হারিয়ে যাবে। আর এর চূড়ান্ত ও নেতিবাচক ধাক্কা লাগবে দেশের অন্যতম আম উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁর সামগ্রিক অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









