টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের কারণে আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে তিস্তা নদীর পানি। সোমবার (২৯ জুন) সকাল ৯ টায় ডালিয়া ব্যারেজ পয়েন্টে নদীর পানি ২ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে এবং বেলা ১২ টায় বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর আগে রবিবার রাত ১১ টায় বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে পানি প্রবেশ করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অপরদিকে গত ১২ ঘন্টার ব্যবধানে ধরলা নদীর পানি প্রায় এক মিটার (১০০ সেন্টিমিটার) বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, রবিবার সন্ধ্যা ৬ টায় শিমূলবাড়ি পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ১৩৪ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও সোমবার সকাল ৬ টায় বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বরাত দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, তিস্তা নদী ডালিয়া পয়েন্টে সোমবার সকাল ৯ টায় পানি সমতল ছিল ৫২.১৩ মিটার যা বিপদসীমার ২ সে.মি. নিচে অবস্থান করছে। বিগত ১২ ঘন্টায় পানির সমতল ১৪ সে.মি. হ্রাস পেয়েছে। তবে কাউনিয়া (রংপুর) পয়েন্টে পানির সমতল ২৯.২৫ মিটার যা বিপদসীমার ৫ সেমি. নিচে এবং ওই পয়েন্টে বিগত ১২ ঘণ্টায় ৬৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়া সোমবার সকাল ০৮টার তথ্য অনুযায়ী উজানে ভারতের দোমুহুনি পয়েন্টের পানি সমতল ৮৫.৫৬ মিটার, বিগত ১২ ঘন্টায় ২২ সে.মি. হ্রাস পেয়েছে এবং গজলডোবা পয়েন্টের পানি সমতল ১০৯.৭০ মি., বিগত ১২ ঘন্টা ধরে সেখানে পানি স্থিতিশীল রয়েছে।
উজানে পানি সমতল হ্রাস পাওয়ায় আগামী ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত তিস্তা নদীর পানি সমতল ডালিয়া পয়েন্টে হ্রাস পেয়ে পরবর্তীতে স্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে। উজানে আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকায় পরবর্তীতে পানি সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে এবং আগামী ২৪-৪৮ ঘণ্টায় ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে।
এর আগে গত ২৩ জুন একবার তিস্তার পানি বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপরে উঠলেও দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে এবার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
ইতোমধ্যে নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। রাতের মধ্যে বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে এবং নদী তীরবর্তী অনেক বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে অনেকে বসতবাড়ি ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। অধিকাংশ এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। চরাঞ্চলে তেমন আবাদ না থাকলেও মৎস্য চাষিদের পুকুরের মাছ পানির সঙ্গে ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে পাটগ্রামের গড্ডিমারী, দোয়ানী, ছয়আনী, সানিয়াজান, সিঙ্গামারী, সিন্দুর্না, হলদিবাড়ী ও ডাউয়াবাড়ী; কালীগঞ্জের ভোটমারী, শৈলমারী ও নোহালী; আদিতমারীর মহিষখোচা, গোবর্ধন, কালমাটি, বাহাদুরপাড়া ও পলাশী এবং সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, তাজপুর ও গোকুন্ডা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল।
স্থানীয় বাসিন্দা তোফাজ্জল ইসলাম বলেন, কাল রাত থেকে পানি বাড়তে শুরু করেছে। এর সঙ্গে ভারী বৃষ্টিও হচ্ছে। এবার বন্যা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। আমরা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উঁচু স্থানে সরিয়ে নিয়েছি, তবে এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহায়তা পাইনি।
গোবর্ধন এলাকার বাসিন্দা তানজিলা আক্তার বলেন, গত রাতেই আমাদের বাড়িতে পানি উঠে গেছে। বাধ্য হয়ে আমরা রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছি। টানা বৃষ্টির মধ্যে খুব কষ্টে দিন কাটছে। তিস্তা আমাদের শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, আগামী ৭২ ঘণ্টা দেশে ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি বা তার ওপরে থাকতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যার পাশাপাশি পানি কমে যাওয়ার পর নদীভাঙনের আশঙ্কাও রয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তুত রয়েছে। বিশেষ করে তিস্তার ডান তীর বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









