যে ডিম মানুষের পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস, সেই ডিমই এবার হয়ে উঠেছে খামারিদের কান্নার প্রতীক। উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় ক্ষোভ আর হতাশায় মহাসড়কেই শত শত ডিম ভেঙে প্রতিবাদ জানিয়েছেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার পোলট্রি খামারিরা। তাদের দাবি, ডিম নয়—ভেঙে পড়ছে হাজারো খামারি পরিবারের স্বপ্ন।
শনিবার (৪ জুলাই) সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের শ্রীপুর উপজেলার জৈনাবাজার এলাকায় শিমুলতলা পোলট্রি খামারি অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অন্তত ৫০ জন খামারি অংশ নেন। পরে তারা মহাসড়কের ওপর শত শত ডিম ভেঙে প্রতীকী প্রতিবাদ জানান।
খামারিদের অভিযোগ, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে গড়ে ৯ টাকা ৮০ পয়সা খরচ হলেও পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৭ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি ডিমে প্রায় আড়াই টাকা লোকসান হচ্ছে। টানা প্রায় ছয় মাস ধরে এভাবে লোকসান গুনতে গুনতে অনেক খামারি ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন, আবার অনেকেই বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
খামারিদের ভাষ্য, বাজারে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে উৎপাদক ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তাকেও বেশি দামে ডিম কিনতে হচ্ছে। এই বৈষম্যের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন প্রান্তিক খামারিরা।
মানববন্ধনে খামারিদের হাতে ছিল নানা প্ল্যাকার্ড। সেখানে লেখা ছিল— “ডিম খেলে পুষ্টি মেলে, খামারিরা কেন ঋণের জালে, ডিমের দাম কমলো কেন, জবাব চাই, যে দেশে একটি ভালো মানের সিগারেটের দাম ২৩ টাকা, সেই দেশে একটি ডিমের দাম সাড়ে ৭ টাকা হয় কীভাবে?—এসব স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
তেলিহাটি ইউনিয়নের লোহাই বাজার এলাকার খামারি রাসেল প্রধান বলেন, ‘‘দিন-রাত পরিশ্রম করে ডিম উৎপাদন করছি, কিন্তু সেই পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছি না। লাভ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের পোলট্রি শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’’
শ্রীপুর উপজেলা পোলট্রি খামারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল মতিন বলেন, ‘‘মুরগির বাচ্চা, খাদ্য ও ওষুধের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অথচ ডিমের দাম কমছে। উৎপাদন ব্যয় মেটানোই এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হাজার হাজার খামারি পথে বসবেন।’’
খামারিদের দাবি, ডিমের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, মুরগির খাদ্য, বাচ্চা ও ওষুধের দাম কমানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করতে হবে। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন তারা।
শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন জানান, উপজেলায় প্রায় সাড়ে তিনশ লেয়ার খামার রয়েছে। এসব খামারে প্রায় এক হাজার শ্রমিক কাজ করেন এবং প্রতিদিন প্রায় ১৩ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে।
খামারিদের ভাষায়, আজ মহাসড়কে ভেঙেছে ডিম, কিন্তু ভেঙে যাচ্ছে আমাদের স্বপ্নও। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের পোলট্রি শিল্প ভয়াবহ সংকটে পড়বে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









