ডেঙ্গুতে চলতি বছর ৫ জনের মৃত্যু। ফগিং চললেও কমছে না মশার উপদ্রব বর্ষার আগেই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। বর্ষা শুরু না হতেই ডেঙ্গুর প্রকোপে উদ্বেগ বাড়ছে ময়মনসিংহে।
চলতি বছর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, একের পর এক রোগীর মৃত্যুতে বাড়ছে আতঙ্কও। তবে রোগীর চাপ বাড়লেও এখনো সেখানে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড চালু হয়নি।
অন্যদিকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন বলছে, মশক নিধনে নিয়মিত ফগিং, লার্ভিসাইড প্রয়োগ, ড্রেন পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম চলছে। তবে নগরবাসীর প্রশ্ন, এত কর্মসূচির পরও সন্ধ্যা নামলেই কেন মশার উপদ্রব অসহনীয় হয়ে ওঠে?
মৃত্যু বাড়ছে, বাড়ছে হাসপাতালের চাপ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মঙ্গলবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার গাজিরপাড়া গ্রামের চমক ফুল (৬৫)। গত ২৭ জুন তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে ২৯ জুন তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি বছর এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী। তাদের মধ্যে ৯৭ জন পুরুষ, ২৫ জন নারী এবং ১১ জন শিশু। জানুয়ারিতে ২২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১ জন, মার্চে ১১ জন, এপ্রিলে ৯ জন, মে মাসে ২০ জন এবং জুনে সর্বোচ্চ ৫৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে একজন এবং জুন মাসে চারজনসহ মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের সহকারী ফোকাল পারসন মোস্তফা ফয়সাল বলেন, ‘ডেঙ্গুর প্রকোপ সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত বেশি থাকে। আপাতত বিভিন্ন মেডিসিন ওয়ার্ডে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর সংখ্যা বাড়লে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হবে।’
২০২৫ সালে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা এখনো ভুলতে পারেননি ময়মনসিংহের মানুষ। সে বছর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়। একপর্যায়ে নির্ধারিত শয্যার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি হওয়ায় মেঝেতেও চিকিৎসা দিতে হয়েছিল। গত বছরের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এবার শুরু থেকেই সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে পর্যাপ্ত বাজেট রাখা হয়েছে। ফগিং, লার্ভিসাইড প্রয়োগ, ড্রেন পরিষ্কার, ঝোপঝাড় অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
মার্চ মাস থেকেই নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা যায়, অনেক এলাকায় ড্রেনে জমে আছে আবর্জনা। কোথাও দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পানি, আবার কোথাও নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ, পরিত্যক্ত টায়ার, ড্রাম, ফুলের টব কিংবা প্লাস্টিকের পাত্রে জন্ম নিচ্ছে এডিস মশা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বর্ষা মৌসুম এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। অথচ ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। তাই এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ভাটিকাশর এলাকার বাসিন্দা আনিছুর রহমান ফারুক বলেন, ‘সন্ধ্যার পর দরজা-জানালা খুলে বসা যায় না। ফগিংয়ের ধোঁয়া আসে ঠিকই, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার আগের মতো মশা।’
কালীবাড়ি এলাকার গৃহিণী আসমা আক্তার বলেন, ‘প্রতিদিন কয়েল, স্প্রে ব্যবহার করতে হচ্ছে। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে আতঙ্কে থাকি। শুধু ধোঁয়া দিলে হবে না, ড্রেন আর জলাবদ্ধতা দূর করতে হবে।’
গোয়ালকান্দি এলাকার বাসিন্দা অনিক খান বলেন, ‘শুধু ধোঁয়া দিলেই হবে না। ছোট ছোট ড্রেন, ম্যানহোল আর যেখানে পানি জমে থাকে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করলে ডেঙ্গু কমবে না।’
বড়বাজারের ব্যবসায়ী চন্দন আলম বলেন, ‘মশার কারণে দোকানে বসে থাকা কঠিন হয়ে যায়। ক্রেতারাও বিরক্ত হন।’
চরপাড়া এলাকার নাসারুল্লাহ বলেন, ‘প্রতি বছর বর্ষা এলেই অভিযান শুরু হয়। কিন্তু সারা বছর পরিকল্পিতভাবে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে এত সমস্যা হতো না। অনেক এলাকায় এডিস মশা প্রচলিত কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে। তাই শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর করলে স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত লার্ভা জরিপ, হটস্পট চিহ্নিতকরণ, ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’
সমাজ রুপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানছেন বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু হটস্পট ম্যাপিং, নিয়মিত লার্ভা জরিপের ফল প্রকাশ, কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা, ড্রেন ও খাল পরিষ্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন, নির্মাণাধীন ভবনে কঠোর নজরদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা জরুরি।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এইচ. কে. দেবনাথ বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন সকালবেলা লার্ভিসাইড এবং বিকেলে অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিফলেট বিতরণ করে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে এবং লার্ভা শনাক্তে বিশেষ টিম কাজ করছে। কোথাও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে চারজন এবং জুন মাসে সাতজন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। বর্তমানে সবাই সুস্থ আছেন এবং নিজ নিজ বাসায় রয়েছেন।’
ওষুধের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ওষুধ সংগ্রহ করছি। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে Malathion ও Temephos সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও একই ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে।’
ডা. দেবনাথ আরও বলেন, ‘শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। সবাইকে নিজ নিজ বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে এবং কোথাও যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের দৃষ্টিতে এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে সামনে পরিস্থিতি কী হবে, তা বলা যাচ্ছে না। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবার সম্মিলিত সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনুজ্জামান বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিয়মিত মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারিও রয়েছে। নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বাড়ির ছাদ, আঙিনা, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা যেকোনো পাত্রে তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









