সরকার নারীর ক্ষমতায়ন, আত্মকর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা ও বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে উপজেলা পর্যায়ে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় পরিচালনা করছে। কিন্তু সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলায় সেই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নিয়মিত অফিস সময়ে কার্যালয়টি তালাবদ্ধ থাকায় সেবা নিতে এসে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নারী ও সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদ চত্বরে অবস্থিত উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। অফিসের নামফলকে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে মো. আফজাল হোসেন-এর নাম লেখা থাকলেও আশপাশের সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই তার নিয়মিত উপস্থিতির বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
স্থানীয়রা জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই তাকে অফিসে দেখা যায় না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অফিস সহকারী মো. মোজাম্মেল হক দায়িত্বে থাকলেও অফিস চলাকালীন সময়ে তাকেও পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অনুপস্থিত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আশপাশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মচারীরা জানান, তারা কখনোই তাকে নিয়মিত অফিস করতে দেখেননি। এমনকি তিনি কোথায় অবস্থান করেন বা কীভাবে অফিস পরিচালিত হচ্ছে, সে বিষয়েও কেউ স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
কার্যালয়ের দরজার পাশে একটি কাগজে অফিস সহকারী মো. মোজাম্মেল হকের নাম ও মোবাইল নম্বর টানানো রয়েছে। কিন্তু সেই নম্বরে বারবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। কেউ কেউ জানান, ফোন ধরলেও কোনো কথা না বলে কিছুক্ষণ পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, অফিস সহকারী মাঝে মধ্যে রাতের বেলা অফিস খুলে কিছুক্ষণ অবস্থান করে চলে যান। অথচ দিনের বেলা অফিস সময়জুড়ে কার্যালয়টি তালাবদ্ধই থাকে। ফলে নারী উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, ভাতা, আইনি সহায়তা ও অন্যান্য সরকারি সেবা নিতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন সেবাপ্রার্থীরা।
সদর ইউনিয়নের নয়াহালট গ্রামের আরিফ মিয়া, জামালগঞ্জ নতুনপাড়ার জয়নব খাতুন, বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাফছা আক্তারসহ একাধিক ভুক্তভোগী জানান, গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ে বারবার এসেছেন। কিন্তু কর্মকর্তা কিংবা অফিস সহকারী—কাউকেই পাননি। এতে তাদের সময়, অর্থ ও শ্রম নষ্ট হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুধু তারা নন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে প্রতিদিন অসংখ্য নারী প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা নিতে এসে তালাবদ্ধ অফিস দেখে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের ঠিক সামনেই অবস্থিত। এরপরও কীভাবে দিনের পর দিন একটি সরকারি অফিস তালাবদ্ধ থাকে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী অনুপস্থিত থাকেন—এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনের চোখের সামনেই যদি একটি সরকারি দপ্তর কার্যত অচল হয়ে পড়ে থাকে, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় গিয়ে প্রতিকার চাইবে?
জানা গেছে, এর আগেও স্থানীয় সাংবাদিকরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরে এনেছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
সুনামগঞ্জ জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এজেএম রেজাউল আলম বিন আনছার বলেন, ‘জামালগঞ্জ মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আফজাল হোসেন ও অফিস সহকারী মোজাম্মেলের কার্যক্রম ভালো নয়, খুবই খারাপ। তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নয়; এটি মন্ত্রণালয়ের। লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা বিষয়টি প্রধান কার্যালয়ে পাঠাতে পারব। শুধু জামালগঞ্জ নয়, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার ও জগন্নাথপুরেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।’
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রাণী মোদক বলেন, “আমি আগামীকাল তাকে ডাকব।” এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সরকারি অফিসে দায়িত্বে অবহেলা এবং দীর্ঘদিন জনসেবা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত নিয়মিত সেবা কার্যক্রম চালু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বর্তমানে প্রশ্ন উঠেছে—নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি সরকারি দপ্তর যদি মাসের পর মাস কার্যত অচল থাকে, তাহলে সেই দপ্তরের সেবা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত সাধারণ নারীদের দায়ভার নেবে কে?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









