টানা বৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয়, আসাম ও ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগের সবকটি নদ-নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল থেকে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার ছয়টি নদীর অন্তত নয়টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বানের জলে তলিয়ে গেছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চল। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন তিন গ্রামের অন্তত ১০ হাজার মানুষ। বন্যায় তলিয়ে গেছে সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও আউশ ফসলের মাঠ।
টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলের কারণে সিলেট বিভাগজুড়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডও।
অন্যদিকে টানা বৃষ্টিতে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় টিলা ধসের ঘটনা ঘটেছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় চার জেলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ টিলা চিহ্নিত করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।
গোলাপগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোরে উপজেলার লক্ষ্মণাবন্দ ইউনিয়নের পূর্বভাগ গ্রামে টিলা ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে ময়না মিয়া নামের এক ব্যক্তির বসতঘরের বেশ কিছু অংশ ভেঙে যায়। ঘটনার সময় পরিবারের সদস্যরা দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত ময়না মিয়া বলেন, ‘‘হঠাৎ করেই টিলার মাটি ধসে আমার ঘরের ওপর পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে ঘরের বেশ কিছু অংশ ভেঙে যায়। আমরা প্রাণ নিয়ে বাইরে বের হতে পেরেছি। ঘরবাড়ির অনেক ক্ষতি হয়েছে।’’
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, সুরমা-কুশিয়ারাসহ সবকটি নদ-নদীর পানি বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিপৎসীমার নিচে অবস্থান করছিল। তবে অমলশিদ ও কানাইঘাটসহ কয়েকটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে এবং যেকোনো সময়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিলেট জেলা প্রশাসন ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। একই সঙ্গে ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমান্তঘেঁষা এলাকায় ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ বা স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ৭২ ঘণ্টা সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। অবিরাম বৃষ্টির কারণে পাহাড় ও টিলা ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ‘‘মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সিলেটের সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। তবে উজানের পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার সুযোগ থাকায় পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।’’
সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা বলেন, ‘‘জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ টিলা এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘সব উপজেলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রয়েছে এবং মাঠ প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।’’
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হবিগঞ্জে ৬১.৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। খোয়াই নদীর পানি বিপজ্জনকভাবে বাড়ায় শহর রক্ষা বাঁধ সংলগ্ন এলাকা ও আশপাশের বাসিন্দাদের মাঝে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান জানান, এ অঞ্চলের হাওরগুলো প্রায় সর্বোচ্চ পানি ধারণক্ষমতায় পৌঁছে গেছে। ফলে নতুন করে আসা পানি ধীরগতিতে নিষ্কাশিত হচ্ছে এবং খোয়াই নদীর ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কমলগঞ্জের ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ৩টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে কমলগঞ্জের সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ইউনিয়নের ১২টি গ্রামসহ উপজেলার অন্তত ২৫টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে ইসলামপুর ইউনিয়নের ভান্ডারিগাঁও, গঙ্গানগর, শ্রীপুর, মোকাবিল, কোণাগাঁও, বেড়িগাঁওসহ ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে এলাকার ফসলি জমি ৩-৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং পুকুর ও ফিশারির মাছ বানের জলে ভেসে গেছে।
উজানের এই ঢলে আদমপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ঘোড়ামারা, বন্দেরগাঁও, ভানুবিল, উত্তরভাগ, জালালপুরসহ ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে বলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবদাল হোসেন জানিয়েছেন।
ইতোমধ্যে পানিবন্দি মানুষজন গবাদিপশুসহ বিভিন্ন উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। এদিকে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে, যার ফলে নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
পাউবোর মৌলভীবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, ‘‘মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার এবং ধলাই নদীর পানি ৩৩ সেন্টিমিটার ওপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। নদীর বাঁক বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’’
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জে চলতি বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা এ মৌসুমে একদিনে সর্বোচ্চ। ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা ঢলের প্রভাবে জেলার নদ-নদীর পানিও বাড়তে শুরু করেছে। আগামী দুই দিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, টানা বৃষ্টির প্রভাবে জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিচু এলাকায় পানি জমতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে জনজীবনে ভোগান্তি বাড়ছে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুরেরা বেশি সমস্যায় পড়েছেন।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘‘সুনামগঞ্জের পাশাপাশি ভারতের উজান এলাকাতেও বৃষ্টিপাত হচ্ছে। উজানের ঢল এবং স্থানীয় বৃষ্টির কারণে নদ-নদীর পানির স্তর বাড়ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী দুই-এক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে নদ-নদীর পানি আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









