‘‘কারোর মুখে এখন আর ঠিকমতো খাবারও যায় না। দিন কাটে কষ্টে। কেউ আর হাসে না। আমি শুধু চাই আমার বাবা আগের মতো সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক। সবাই যদি একটু সাহায্য করেন, তাহলে হয়তো আমার বাবাকে বাঁচানো যাবে।’’ কথাগুলো বলছিল তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া কন্যা। পিতার এমন অসহায় অবস্থা দেখে তার নিষ্পাপ চোখে এখন শুধু কান্না আর বাবাকে হারানোর ভয়।
একটি পরিবারের স্বপ্ন, হাসি আর ভবিষ্যৎ অনেক সময় একজন মানুষের কাঁধেই ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু সেই মানুষটিই যখন মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন, তখন পুরো পরিবারে নেমে আসে অনিশ্চয়তার অন্ধকার। ঠিক এমনই এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন নীলফামারীর সৈয়দপুর বাঁশবাড়ি আমিন মোড় এলাকার দিনমজুর মো. খুরশিদ (৫২)।
পেশায় তিনি একজন সাধারণ ট্রাঙ্ক বাক্স ও বালতি তৈরির মিস্ত্রি। ‘দিন আনে দিন খায়’ অবস্থায় চলতো চার সদস্যের সংসার। স্ত্রী, নবম শ্রেণিতে পড়া এক ছেলে এবং তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তার ছোট্ট সুখের পরিবার।
দীর্ঘদিন অসুস্থতায় তার জীবনে নেমে আসে কালো অধ্যায়। পরীক্ষায় ধরা পড়ে তিনি বুকাল মিউকোসা ক্যানসারে আক্রান্ত। সেই থেকে থেমে গেছে তার কর্মজীবন। যে হাত একসময় পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিত, আজ সেই হাত অসহায়ভাবে বিছানায় পড়ে আছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীর এমন অসহায়ত্বে ছাপ পড়েছে পুরো পরিবারে।
ধারদেনা করে ইতিমধ্যে চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়েছে কয়েক লাখ। কিন্তু নিম্নআয়ের এই পরিবারের পক্ষে আর এত বড় চিকিৎসা ব্যয় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বিভিন্ন মসজিদে সাহায্যের আবেদন, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং মানবিক মানুষের সহযোগিতায় এতদিন চিকিৎসা চালিয়ে আসা হয়েছে। এখন সেই সহায়তার পথও প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। অর্থ সংকটের কারণে পরবর্তী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে তার জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্বজনরা।
বর্তমানে তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান ও ক্যান্সার রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জাহান আফরোজা লাকীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, খুরশিদের চিকিৎসার অংশ হিসেবে ৭-৮টি কেমোথেরাপি দিতে হবে। প্রতিটি কেমোথেরাপির জন্য প্রায় ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিন শুধু ওষুধের পেছনেই খরচ হচ্ছে ৭০০ টাকা। চিকিৎসার পরবর্তী ধাপে রেডিওথেরাপি শুরু হলে ব্যয় আরও কয়েক লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। ফলে আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
খুরশিদের স্ত্রী জানান, পরিবারের আয়ের আর কোনো উৎস নেই। স্বামীর অসুস্থতার পর সংসার চালানোই যেখানে কঠিন হয়ে পড়েছে, সেখানে ব্যয়বহুল ক্যান্সারের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া তাদের সাধ্যের বাইরে। ছোট দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও তারা গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন।
খুরশিদ বলেন, ‘‘সারাদিন বিছানায় শুধু এই ভেবে কান্না করছি যে, ‘আমি যদি না থাকে আমার সন্তান ও পরিবার কে দেখবে। কিভাবে চলবে তারা?’’
সমাজে অনেক বিত্তবান ও মানবিক মানুষ রয়েছেন, যারা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখান। মো. খুরশিদের পরিবারও এমন কিছু সহৃদয় মানুষের সহযোগিতার অপেক্ষায় রয়েছে। সামান্য সহায়তাই হয়তো একজন অসহায় বাবাকে তার দুই সন্তানের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে, একটি পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে এবং নতুন করে বাঁচার আশা জাগাতে পারে।
যদি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সমাজসেবী সংগঠন দিনমজুর মো. খুরশিদের চিকিৎসায় সহযোগিতায় ঘুরে দাঁড়াতে পারে একটি পরিবার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









