বর্ষা এলেই হাওরে শুরু হয় নতুন করে জীবনযুদ্ধ। খেটে খাওয়া মানুষদের বাড়িঘর রক্ষায় মরিয়া হয়ে পড়ে। পানির সঙ্গে বসবাস সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার মানুষের। হাওরে পানি বাড়লে গ্রামগুলোতে পানি ঢোকে, তবে এই পানিতে অভস্ত্য গ্রামের মানুষ। কিন্তু পানি যখন হঠাৎ বাড়তে বাড়তে বন্যা হয়ে ওঠে, তখন দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে আফালের আতঙ্ক। দমকা বাতাসের সঙ্গে হাওরে ওঠা বড় বড় ঢেউকে স্থানীয় ভাষায় ‘আফাল’ বলা হয়।
এই আফালের কারণেই দিশাহারা হয়ে পড়ছেন হাওর পাড়ের মানুষজন। কাটছে নির্ঘুম রাত। হাওরপাড়ের বাড়িগুলো টিকিয়ে রাখতে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে এলাকাবাসী। রাক্ষুসে হাওরের উত্তাল এই ঢেউয়ের (আফাল) কবল থেকে রক্ষা পেতে নানা কৌশল করছেন তারা। তবুও বসতভিটা রক্ষা করতে পারছেন না ভাঙ্গন।
সুনামগঞ্জ জেলার, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর, বিশ্বম্ভরপুর, দিরাই, শাল্লা ও জগন্নাথপুর উপজেলার হাওরপাড়ে বসবাসরত মানুষের চোখের সামনেই ঢেউয়ে ভেঙ্গে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
মধ্যনগর উপজেলার রংচী, ঢুলপুষি, শাইল্লানি, রাঙ্গামাটি, আটাইশা মাছিমপুর, পলমাটি, সাজদাপুর, কাহালা, কামারগাঁও, দুগনই, আমজোড়া, জলুসা গ্রামের মানুষ ‘আফাল’ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
রংচী গ্রামের বাসিন্দা মুহাম্মদ আলী জানান, দিনের বেলা ঢেউয়ের উপদ্রব কম থাকলেও রাতের বেলায় ঢেউয়ের রুপ ভয়াবহ হয়। আর এই ঢেউয়ে বাড়িঘর ভেঙ্গে পথে বসার মত অবস্থা হয়েছে।
পলমাটি গ্রামের বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন জানান, বাঁশ কচুরিপানা দিয়ে ঘরবাড়ি আড়ি (বেধে) দিয়ে কোনো রকম রক্ষা করছি। তবে হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের জন্য প্রত্যেকটি গ্রামে প্রতিরক্ষা দেয়ালের ব্যবস্থা করা হলে আমাদের জন্য দুঃখটা কিছু লাঘব হতো।
এদিকে শাল্লা উপজেলার হাওরগুলোতে ঢেউয়ে কেড়ে নিচ্ছে তাদের যক্ষের ধন। কিছুতেই রক্ষা করা যাচ্ছে না ঘরবাড়ি। তাদের শেষ ভরসাস্থল মাথাগুঁজার ঠাঁইটি এখন কেড়ে নিতে চায় ‘আফাল’। তাই রক্ষা পেতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন তারা। কিন্তু সব চেষ্টাই যেন ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম। ইতিমধ্যে ‘আফাল’র আগ্রাসীর থাবায় বিলীনের পথে উপজেলার শতাধিক বাড়িঘর। হঠাৎ এমন দুর্ভোগে ভিটেমাটি হারানোর দুশ্চিন্তায় তারা নির্বাক।
জানা যায়, ছায়ার হাওর, কালিয়াকোটা, ভান্ডারবিল, বরাম হাওর এলাকায় গেলে চোখে পড়ে মানুষের এমন দুর্দশার চিত্র। ওই এলাকার অধিকাংশ লোকজনই ঘরবাড়ি ফেলে কোনো জায়গায় যেতে চাচ্ছেন না।
দুর্ভোগগ্রস্ত উপজেলার মামুদনগর গ্রামের শহীদ মিয়া জানান, রাত দিন আফালের ভয়ে তারা তটস্থ থাকছেন। সপ্তাহখানেক আগে উত্তাল হাওর তাদের সব কেড়ে নিয়েছে।
মুক্তারপুর গ্রামের পংকজ দাস জানান, তাদের পরিবারে সদস্য ১১ জন। পরিবারের উর্পাজনকারী একজন। এখন কাজ নেই, টাকা নেই, ঘরে চালও নেই। এতদিন কোনোরকম নিজের বসত বাড়িতে পানিবন্দি অবস্থায় টিকে ছিলেন। এখন আফালের জন্য বসতভিটাও আর রক্ষা করা যাবে না। এ নিয়ে রাত দিন তাদের চিন্তার অন্ত নেই।
মামুদনগর গ্রামের সুজন দাস জানান, কচুরিপনা আর গাছের ডাল ও বাঁশের পালা (অগ্রভাগ) দিয়ে আফালের কবল থেকে রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বানের পানি শরীরে লাগলে চুলকায়। তাছাড়া রয়েছে সাপ ও জোঁকের ভয়। গেল কয়েক দিন থেকে আফাল শক্তিশালী হয়ে সবই কেড়ে নিতে চাইছে। তাই ঘরের ভিতরে থাকতে যেমন ভয় হচ্ছে। তেমনি বাড়ি ছেড়ে যেতেও মন চাচ্ছে না। কারণ বাড়ি ছেড়ে গেলে বাড়ি ঘরের চারপাশে কচুরিপানা দেওয়া যাবে না। এমন সুযোগে আফাল আমাদের বাড়ি নিশ্চিহ্ন করে দিবে। তাই তারা বসভিটার মায়ায় বাড়ি ছাড়ছেন না।
নাইন্দ্যা গ্রামের প্রবোধ দাস বলেন, ‘‘আফালের ভয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। হাওরের বিশাল ঢেউ ঘরের বেড়া আর ভিটার মাটি ছাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে আফাল থেকে রক্ষা মিলছে না।’’
হাবিবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুবল চন্দ্র দাস বলেন, ‘‘বর্ষার সময় হাওরবাসীর একটাই আতঙ্ক আফাল (বড় ঢেউ)। এই আফালের কারণে বাড়িঘরের ভাঙ্গন দিন দিন বেড়েই চলছে। তবে হাওরপাড়ের এসব গ্রামগুলোর জন্য সরকারিভাবে প্রতিরক্ষা দেয়ালের উদ্যোগ নিলে হয়তো শাল্লার হাওরপাড়ে বসবাসরত মানুষ কিছুটা উপকৃত হবে।’’
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘‘এ সময়টাই হাওরপাড়ের মানুষের বিপদজ্জনক। পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে হাওরে বড় বড় ঢেউ সৃষ্টি হয়। আর এই ঢেউয়ের কারনে বাড়িঘর বেধেও রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এই বিষয়ে এলজিইডি অফিসের ইঞ্জিনিয়ারের সাথে কথা বলা হবে। আগামী মৌসুমে ভাঙ্গন এলাকা চিহ্নিত করে প্রতিরক্ষা দেয়ালের ব্যবস্থা করার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে একটা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাবনা পাঠাবো।’’
মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জয় ঘোষের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









